বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

২০২৫ সালে ভারত সীমান্তে ৩৯ হত্যাকান্ডঃ বিএসএফের গুলিতে খুন ৩০ জন

২০২৫ সালে ভারত সীমান্তে ৩৯ হত্যাকান্ডঃ বিএসএফের গুলিতে খুন ৩০ জন
৪৫ Views

            ষ্টাফ রিপোর্টার\ বিদায়ী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্ততঃ ৩০ জন নিহত হয়েছেন। দু’জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাছাড়া, সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় নাগরিকদের গুলিতে ও হামলায় আরো অন্ততঃ ৭ জন বাংলাদেশি খুন হয়েছেন। সব মিলিয়ে গত বছর ভারত সীমান্তে ৩৯ হত্যাকান্ড ঘটেছে। মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং নিজেদের তথ্যানুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এ চিত্র তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।

            প্রতিবেদনে জানানো হয়, ভারত সীমান্তে বিএসএফের গুলিসহ উল্লেখিত নানা ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ৩৯ জন। ৬৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে কমপক্ষে ৩ হাজার ৪৯৩ জনকে বাংলাদেশে পুশইন ও ভারতীয় জলসীমার কাছে বঙ্গোপসাগর থেকে ১৪৩ জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে ভারতীয় কোস্টগার্ড। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে বান্দরবানের নাই্যংছড়ি সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হয়ে দু’জন আহত হয়েছেন। আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে এক আনসার সদস্যসহ ১২ জন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন এবং একজন নিহত হয়েছেন। সীমান্তের নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের জলসীমা থেকে ২১টি ট্রলারসহ কমপক্ষে ১৭৬ জন জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৫ সালে দেশে নানাবিধ সহিংসতার দিক বিবেচনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। বিশেষত রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন এবং শিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

            ৯১৪ রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৩৩ঃ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে সারাদেশে রাজনৈতিক ও দলীয় আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ পরায়ণতা, সমাবেশকেন্দ্রিক সহিংসতা, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখল কেন্দ্রিক ৯১৪টি সহিংসতায় ১৩৩ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে বিএনপির ৯৩ জন, আওয়ামী লীগের ২৩ জন, জামায়াতের ৩ জন, ইনকিলাব মঞ্চের একজন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের একজন, ইউপিডিএফের ৬ জন এবং চরমপন্থি দলের একজন রয়েছেন। এছাড়া, আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৫১১ জন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী সহিংসতার ৫৪টি ঘটনায় ৩ জন নিহত এবং ৪৯৪ জন আহত হয়েছেন। বিদায়ী বছরে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের নামে কমপক্ষে ২৪৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১১ হাজার ৯৩৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৪২ হাজার ৫২৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এছাড়া, বিভিন্ন মামলায় ও যৌথ বাহিনীর অভিযানে ৫০ হাজারের অধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। পুলিশ গত এক বছরে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের অন্ততঃ ৪৭ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে।

            মব-গণপিটুনিতে নিহত ১৬৮ঃ মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৯২টি ঘটনায় মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে ১৬৮ জন নিহত ও ২৪৮ জন আহত হয়েছেন।

            ৩ সাংবাদিক খুনঃ বিদায়ী বছরে ৩১৮টি হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩ জনকে হত্যা, ২৭৩ জনকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও আহত, ৫৭ জনকে লাঞ্ছিত, ৮৩ জনকে হুমকি এবং ১৭ জন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। ৩৪টি মামলায় ১০৭ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর অধীনে ২৭টি মামলায় ২৪ জনকে গ্রেফতার এবং ৫৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সারাদেশে ৪৭টি সভা-সমাবেশ আয়োজনে বাধা প্রদান, ১৪৪ ধারা জারি, সংঘর্ষ, সভাসমাবেশ থেকে আটকসহ বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। এতে ৫১২ জন আহত এবং ৩৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

            বিচার-বহির্ভূত হত্যা, থানা ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশি হেফাজত, নির্যাতন, গুলি, বন্দুকযুদ্ধ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংষর্ষ ইত্যাদি ঘটনায় ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬ জন সংঘর্ষে বা কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে, ১২ জন নির্যাতনে, ১২ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এবং ১০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। এছাড়া পুলিশের ভয়ে পালাতে গিয়ে ও অসুস্থ হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। কারাগারে বা কারা হেফাজতে অসুস্থ, আত্মহত্যা ও নির্যাতনে ৯২ জন আসামি (৩০ জন কয়েদী ও ৬২ জন হাজতি) মারা গেছেন।

            ধর্ষণের শিকার ৮২৮, ধর্ষণের পর খুন ২৮ জনঃ ২০২৫ সালে কমপক্ষে ২ হাজার ৪৭ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮২৮ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, এর মধ্যে ৪৭৪ জন ১৮ বছরের কম বয়সী/শিশু। এছাড়া ১৭৯ জন নারী ও কন্যা শিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৮ জনকে। এসব ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন নারী। ৪১৪ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তন্মধ্যে শিশু ২৩৬ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৩৫ জন (আত্মহত্যা-৪) ও আহত ৩২ জন। তাছাড়া পারিবারিক সহিংসতায় ৩৮৩ জন (আত্মহত্যা ১৯৪ জন) নিহত ও আহত ১৩৩ জন। অ্যাসিড সহিংসতায় শিকার হয়ে নিহত দু’জন এবং আহত দু’জন।

            হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মব সহিংসতা, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা, নির্বাচনী সহিংসতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের বিষয় সমাধান না করা হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যেতে পারে। এ সময় সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরো জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহŸান জানানোর পাশাপাশি সব নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানানো হয়।

Share This

COMMENTS