
নিজস্ব প্রতিনিধি\ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলা কুমিল্লায় মাদকের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন এ জেলা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে মাদকসহ অন্যান্য চোরাচালান পণ্য। জেলার ৫টি উপজেলার অর্ধশতাধিক এলাকায় ভারত সীমান্ত দিয়ে আসছে কোটি-কোটি টাকার মাদক। যা ছড়িয়ে পড়ছে পুরো দেশে। কুমিল্লা সীমান্তের এসব এলাকায় ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা, হুইস্কিসহ নানা প্রকার মাদকের জমজমাট কারবার চলছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক স্থানে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সাথে সখ্যতা গড়েই মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও পুলিশ ও বিজিবি বলছে, মাদক নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করেই দায়িত্ব পালন করছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। প্রতিদিনই অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক ও চোরাচালান পণ্য জব্দ এবং আটক হচ্ছে মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারীরা।
জেলার আইন-শৃঙ্খলা কমিটির তথ্য মতে, গত ৪ মাসে কুমিল্লায় বিভিন্ন বাহিনী ও দপ্তরের মাদক ও চোরাচালানবিরোধী অভিযানে ৯২৯ জনকে আটক করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৪২৫টি।
জানা গেছে, ভারত সীমান্তবর্তী কুমিল্লার ৫ উপজেলায় ১০৫ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা রয়েছে। জেলার চৌদ্দগ্রাম, সদর দক্ষিণ, সদর, বুড়িচং এবং ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার অর্ধশতাধিক এলাকা দিয়ে অহরহ বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বিভিন্ন মাদকদ্রব্যসহ অন্যান্য চোরাচালান পণ্য। এর মধ্যে বিজিবির তালিকায় রয়েছে ১২টি হটস্পট। বিশেষ করে জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার আশাবাড়ি, তেতাভূমি, বুড়িচং উপজেলার ছয়গ্রাম, চড়ানল, ভালক, বাঁশতলী, নারায়ণপুর, চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আমানগন্ডা, সদর উপজেলার গোলাবাড়ি, নিশ্চিন্তপুর, সদর দক্ষিণ উপজেলার রাজেশপুর,যশপুর, সূর্যনগর এলাকা দিয়ে ফ্রি স্টাইলে কোটি কোটি টাকার মাদক ঢুকছে।
এছাড়াও জেলার বৌয়ারা, যাত্রাখিল, একবালিয়া, জয়নগর, মুড়াপাড়া, কচুয়ারপাড়, ধনপুর, সুবর্ণপুরসহ সীমান্তের অন্যান্য আরো বেশ কিছু পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন মাদক ও চোরাচালানের কারবার চলছে অহরহ। বিজিবির দাবি, কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার আশাবাড়ি থেকে সালদা পর্যন্ত এলাকায় সীমান্তে বেড়া না থাকায় খোলা অংশ দিয়ে মাদক ও চোরাচালান পণ্য বেশি প্রবেশ করছে বাংলাদেশে। এসব মাদক ও চোরাচালান পণ্য কখনো সড়ক পথে, কখনো ট্রেনে চলে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ।
শুধু যে কুমিল্লা সীমান্ত দিয়েই বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করছে- তা নয়। মাদক পরিবহনের বড় রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এ মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে প্রায় প্রতিদিনই জেলা ও হাইওয়ে পুলিশের অভিযানে ইয়াবার বড় বড় চালান জব্দ হচ্ছে। সম্প্রতি জেলা পুলিশের অভিযানে ইয়াবার একটি বিশাল চালান জব্দ করা হয়। অভিযানের বিষয়ে সাংবাদিকদের কাছে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান ।
তিনি বলেন, মাদক উদ্ধার কিংবা মাদক বিরোধী অভিযান কিন্তু শুধু পুলিশের কাজ না। এ জন্য অন্যান্য বাহিনী ও দপ্তর রয়েছে। যেহেতু কুমিল্লা একটি সীমান্তবর্তী এলাকা এখানে মাদকের আগ্রাসন বেশি। অন্যান্য দপ্তরের পাশাপাশি জেলা পুলিশও মাদকের বিরুদ্ধে জিরু টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করছে। এ কারণেই সারা দেশে মাদক উদ্ধার ও আসামি গ্রেপ্তারে কুমিল্লা জেলা পুলিশ দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। আমি যতোদিন দায়িত্বে আছি- এ জেলায় মাদকের আগ্রাসন রুখে দেয়া হবে। আমাদের এখন প্রধান লক্ষ্য মাদকের মূল ডিলারদের চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট প্রমাণপত্র সংগ্রহের পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। কুমিল্লা থেকে আমরা মাদকের মূলোৎপাটন করে ফেলতে চাই। এতে যদি আমাদের বাহিনীর কেউ জড়িত থাকে কিংবা কারো সংশ্লিষ্টতা খোঁজে পাওয়া যায় তাৎক্ষণিক তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিজিবি কুমিল্লার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল রকিবুল হাসান বলেন, সীমান্তে চোরাচালানসহ অপরাধ দমনে বিজিবি সবসময় তৎপর অবস্থানে রয়েছে। আমাদের বিভিন্ন বিওপির টহল দল প্রায় প্রতিদিনই মাদকসহ চোরাচালানকৃত পণ্য জব্দ করছে। সীমান্ত এলাকার কয়েকটি পথ আমরা ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করে আমাদের তৎপরতা বাড়িয়েছি। বিশেষ করে সীমান্তের যেসব স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নেই ওইসব এলাকাগুলোতেই মাদক ব্যবসায়ীসহ চোরা কারবারীদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। অনেক সময় বিজিবির অবস্থান টের পেলে চোরাকারবারী পণ্য ফেলে পালিয়ে যায়। কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্তের ওপারেও চলে যায়। এসব ক্ষেত্রে বিজিবির সদস্যরা ও প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে। যার কারণে মালামাল জব্দ করা গেলেও চোরা কারবারিদেরকে আটক করা সম্ভব হয় না। আমরা চেষ্টা করছি সীমান্তে মাদক ও চোরাচালান বন্ধে আরো কঠোর হতে। তবে সেজন্য সকল প্রশাসন এবং স্থানীয়দেরকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
কুমিল্লার বিশিষ্টজনরা বলছেন, পুলিশ-বিজিবি কিংবা র্যাবের অভিযানে বিভিন্ন সময়ে মাদক উদ্ধার ও আসামি গ্রেপ্তারে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর তৎপরতা থাকলেও যে দপ্তরটি শুধু মাদক নিয়ে কাজ করেন তাদের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না। পাশাপাশি সামাজিকভাবেও মানুষকে মাদক থেকে নিরুৎসাহীত করার কোনো কার্যক্রমও চোখে পড়ে না।