আগামী নির্বাচন নিয়ে কিছু কথা:


\ মোঃ ছাইদুল্লাহ \
ভ‚মিকা: নির্বাচন এদেশে সাড়া জাগানোর মত একটি শব্দ। ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ভদ্র-অভদ্র, বিবেকবান- বিবেকহীন, ছোট-বড়, পুরুষ-মহিলা সকলেই নির্বাচন নিয়ে কম-বেশ মাতামাতি করে। কিছু লোক এ ব্যাপারে সুচিন্তা করে আর কিছু লোক কুচিন্তা করে। কিছু লোক সুবিবেচনা করে আর কিছু লোক তা করে না। কিছু লোক নর্িাচনকে কেন্দ্র করে অসদুপায়ে টাকা কামানোর ধান্দায় থাকে আর কিছুলোক কালোটাকা বিতরণ করে মতলব হাসিল করার নেশায় থাকে আবার কিছু লোক সুষ্ঠু নির্বাচনের তোয়াক্কা না করে আজীবন ক্ষমতা ধরে রেখে মানুষের স্বাধীনতা হরণ করতে চায়, আর কিছু লোক বিবেকের তাড়নায় আল্লাহর ভয়ে সৎ থাকতে চায়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন চিত্রই বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার পূর্ব ইতিহাস। কিছু বিধি বিধান যথাযথ মেনে চললে আশা করা যায় পূর্বের সকল অপরাধ ও জুলুম-অত্যাচার থেকে জাতি রক্ষা পাবে। (ইনশা আল্লাহ)
নির্বাচন কী ও কেন? নির্বাচন অর্থ- কোন বিষয়ে যাচাই-বাচাই করা, ভাল-মন্দ সঠিক-বেঠিক, উপর্যুক্ত-অনুপর্যুক্ত ইত্যাদি কোন ব্যাপারে জ্ঞান বুদ্ধি ও সুবিবেচনা দ্বারা যথাযথ মূল্যায়ন করা। দেশ, জাতি, সমাজ ও কোন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য উপর্যুক্ত মেধাবী দক্ষ প্রতিনিধি নির্বাচন করতে হয়।
নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব: নির্বাচন এমন অতীব জরুরী একটি বিষয় যা ব্যতিত কোন দেশ, জাতি, রাষ্ট, সমাজ ও প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে না। বরং রাখাল বিহীন বকরীর পালের ন্যায় হয়ে যায়। তাই প্রতিটি সমাজ, দেশ, জাতি, রাষ্ট্র সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হওয়ার জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন অত্যন্ত প্রয়োজন। এজন্যই বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত রাহ্মাতাল্লিল আলামীন প্রিয় নবী স:-এর ইনতেকালের পর, তাঁরই রেখে যাওয়া আল্লাহ প্রদত্ত কিতাব মানবতার মুক্তির সনদ পবিত্র কুরআন মাজীদ ও সুন্নাতে রাসূল স: এর হুবাহু অনুকরণকারী এবং তাঁরই হাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিজ্ঞ সাহাবায়ে কেরাম সর্ব প্রথম যে কাজটি করেছেন তা হলো খলীফা (আমীর) নির্বাচন।
ইসলামে নির্বাচনের পদ্ধতি: প্রিয় নবী স: এর পর খলীফা কে বা কারা হবেন তার স্পষ্ট বর্ণনা তিনি দিয়ে যান নি। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ রেখে গেছেন। সে আলোকে কতিপয় বিজ্ঞ সাহাবায়ে কেরাম আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শ করে প্রিয় নবীর আজীবনের সাথী, তাঁর মরণ সায়াহ্নে মনোনীত ইমাম সায়্যেদুনা হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা: কে প্রথম খলীফা নির্বাচন করেন। অতঃপর অন্যান্য সকলেই তা মেনে নিয়েছেন। তাঁর ইন্তিকালের পূর্বে তিনিই খেলাফত পরিচালনায় সর্বাপেক্ষা উপর্যুক্ত ব্যক্তিত্ব হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা:) কে খলীফা মনোনীত করে যান। দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর রা: এর শাহাদাতের পর কতিপয় সুদক্ষ অভিজ্ঞ সাহাবায়ে কেরাম পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারে পরস্পর আলোচনা-পর্যালোচনা করেন। তাদের অধিকাংশের সুচিন্তিত রায় বা ভোট যিন্নুরাইন হযরত ওসমান রা: এর পক্ষে এসেছে। তাই তিনি তৃতীয় খলীফা হিসেবে নির্বাচিত হোন। অতঃপর বাকী সকলেই তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন।
এভাবেই জ্ঞানী, গুণী ও বিবেকবান বিচক্ষণ ব্যীক্তগণের সুচিন্তিত রায় ও পরামর্শ মোতাবেক খলীফা বা আমীর নির্বাচিত হওয়া অতঃপর অন্যান্য সকলে তা মেনে নিয়ে খলীফার আনুগত্য করাটাই ইসলামের প্রথম যুগে নির্বাচনের ইতিহাস।
আর বিজ্ঞ বিচক্ষণ ব্যক্তিবর্গ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এমন ব্যক্তিকে খলীফা নির্বাচন করতেন যিনি তুলনামূলক সর্বাধিক যোগ্য, কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক দেশ পরিচালনায় দক্ষ হবেন বলে তাঁরা মনে করতেন। তাঁদের মধ্যে কারও নেতৃত্ব, ক্ষমতা ও সম্পদের লোভ ছিল না। যার উপর যে দায়িত্ব অর্পিত হতো, তিনি সে দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করতেন। আর তাঁদের অনুকরণ করা মুসলমানগণের উপর কর্তব্য। প্রিয়নবী স: ফরমান: তোমাদের উপর কর্তব্য হলো আমার আদর্শ এবং সঠিক পথ প্রাপ্ত পথ প্রদর্শক খলীফাগনের আদর্শকে আকড়িয়ে ধরা। (আবু দাউদ-৪৬০৭, ইবনে মাজা-৪৪, তিরমিযি-২৬৭৬)
ইসলামের সোনালি যুগের নির্বাচন পদ্ধতি দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে অবাধ গণতন্ত্র ও রাজতন্ত্র ইসলামে নেই। বরং উপরিউক্ত নিয়মে নির্বাচন করাটাই ইসলামের শিক্ষা। তথা দেশের সুশিক্ষিত বিজ্ঞ-বিচক্ষণ জ্ঞানী-গুণীগণ সুচিন্তিত মতামত বা ভোট দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবেন আর অন্যরা তা সমর্থন করবেন। আর সর্বোচ্চ নেতা দেশের সুশিক্ষিত বিজ্ঞজনের সাথে পরামর্শ করে যোগ্যতা সম্পন্ন নিষ্ঠাবান প্রয়োজনীয় সদস্যদের নিযুক্ত করবেন। তাই সকল মুসলিম দেশের নির্বাচন এভাবেই হওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু মুসলমানদের ভাগ্যের পরিহাস ও ঈমানী দুর্বলতা বা চক্রান্তের শিকার হতে হতে এমনই অবস্থা হলো যে পূর্বের শান্তিময় সোনালি ইতিহাস আমরা যেন ভুলেই গিয়েছি। মহান আল্লাহ যেন আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করে দেন, সকল চক্রান্তের দাবানল থেকে পরিত্রাণ দান করেন, ভবিষ্যতে হেফাজত করেন এবং আমাদের অপরাধগুলো ক্ষমা করেন। ভবিষ্যতে ইসলামী খেলাফত কায়েমে সাহায্য করেন। (আমিন)
এদেশে প্রচলিত নিয়মের আগামী নির্বাচন যেভাবে হওয়া উচিত:
দল বা প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেশের প্রত্যেক ভোটার বা নাগরিককে বিবেক খরচ করতে হবে। অন্ধভাবে কোন দল বা প্রার্থীকে সমর্থন করা যাবেনা। যে দলের অধিকাংশ লোক সৎ, নিষ্ঠাবান, আল্লাহভীরু, নীতিবান ও ন্যায়পরায়ন সে দলকেই সমর্থন করতে হবে। আর প্রার্থীদের মধ্যে যিনি সর্বাধিক আল্লাহ ভীরু সৎ ও নিষ্ঠাবান, ন্যায়পরায়ণ ও দেশপ্রেমিক তাকেই সমর্থন করে ভোট দিতে হবে। আর এটা করতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বিবেকের তাড়নায় দেশের শন্তি ও উন্নতির জন্য, জুলুম-অত্যাচার, দুর্নীতি, গুম, খুন, চাঁদাবাজী বন্ধ করে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। এব্যবস্থা কায়েম হলে দেশের দল, মত, ধর্ম নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষের অধিকার রক্ষা পাবে। বিবেক আল্লাহ প্রদত্ত বড় একটি নেয়ামত। নেয়ামতের কদর ও শুকরিয়া আদায় না করলে দুনিয়া ও আখেরাতে শাস্তি ভোগ করতে হবে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন “তোমরা যদি নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করো তাহলে তোমাদেরকে নেয়ামত বাড়িয়ে দিব আর যদি কুফুরি করো (অকৃতজ্ঞ হও) তাহলে জেনে রেখো আমার শাস্তি বড় কঠোর।” (সূরা ইব্রাহিম- আয়াত: ০৭) সুতরাং বিবেক খরচ করে কাজ না করলে আল্লাহ তায়ালা বিবেক ছিনিয়ে নিবেন, বিবেকহীন জাতিতে পরিণত করে দেবেন। ফলাফল হিসেবে দেশে জুলুম-অত্যাচার ও গুম-খুনের মাত্রা বেড়ে যাবে এবং বিপদগামীগণ পরকালে কঠিন শাস্তি যোগ্য হবে। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, তোমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহর সামনে জবাব দিতে হবে।” (সহীহ বুখারী: ৬৬৫৩) দ্বীনদার আল্লাহভীরু, ন্যায়পরায়ণ প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ দায়িত্ব যথাযথ পালন না করলে মহান আল্লাহর নিকট জবাব দিতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন: “আপনি বলুন হক (সত্য) আগমন করলে বাতিল (মিথ্যা) দূর হয়ে যায় (পালিয়ে যায়)।” (সূরা বণী ইসরাইল- আয়াত: ১১১) বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ছাত্র জনতার গণআন্দোলনের মাধ্যমে বাতিল, মিথ্যাচার জুলুম-অত্যঅচার, হামলা-মামলা, সুদ-ঘুষ, গুম, খুন-খারাবী চাঁদাবাজী-টেন্ডারবাজী, চুরি-ডাকাতি, নির্বাচনের নামে ধোঁকাবাজি, কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে প্রার্থী দেয়া, কালো টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে ভোট ক্রয় করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দেশের তথা জনগনের হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুন্ঠণ করা, আত্মসাৎ করা, আর অবৈধভাবে হারাম টাকা গ্রহণের বিনিময়ে ভোট দিয়ে দেশের সম্পদ আত্মসাতের সুযোগ করে দেয়া বা সহায়তা করা ইত্যাদি সব ধরনের অপরাধ, অপকর্ম, ও হারাম কাজ এদেশ থেকে চিরতরে উৎখাত হওয়া উচিত।
আমরা আশাকরি ৫ই আগষ্টের গণঅভ‚্যত্থানের পর মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করেছে এবং দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করেছে যে, মহাশক্তিধর এক আল্লাহ আছেন যিনি জালেমদেরকে তওবা করে ভাল ও সৎ হওয়ার সুযোগ দেন কিন্তু ছাড় দেন না। জুলুমের মাত্রা বেড়ে গেলে অবশ্যই পাকড়াও করেন। বিশেষ করে যখন পার্থিব সকল শক্তিকে তুচ্ছ করে জালেম জুলুমের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। নিজেকে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী মনে করে। তখনই আল্লাহ জাল্লা শানুহু তাদেরকে পাকড়াও করেন।
সুতরাং অন্তঃবর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহŸান থাকবে যে আগামী নির্বাচন যেন নিরপেক্ষ সুষ্ঠু সুন্দর অনুসরণ যোগ্য হয়। যাতে মানুষের বিবেকের সঠিক ফলাফল প্রকাশিত হতে পারে, নির্বাচনের পূর্বাপর ও চলাকালীন সময় কখনও যেন দ্বিতীয় স্বাধীনতার পূর্বের কোন চিত্রের পুনরাবৃত্তি না হয়, মানুষ যেন শান্তিময়জীবন লাভ করতে পারে, জুলুম-অত্যাচার, সুদ, ঘুষ, ব্যভিচার, চাঁদাবাজী ও ত্রাসমুক্ত জীবন লাভ করে আল্লাহ প্রদত্ত স্বাধীনতার ফল ভোগ করতে পারে, এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে নির্ভয়ে তাঁর পবিত্র বাণী প্রচার প্রসার করতে পারে।
আর ভোটারদের প্রতি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ নসিহত এই যে, দয়া করে টাকা বা সম্পদের বিনিময়ে আপনার মূল্যবান ভোট বা বিবেক বিক্রয় করবেন না। বরং বিবেক খাটিয়ে উপরিউক্ত গুণে গুণাম্বিত দল বা প্রার্থীকে আপনার মূল্যবান ভোট প্রদান করবেন। আপনার বিবেক আল্লাহ প্রদত্ত মহা মূল্যবান একটি সম্পদ তা রক্ষা করবেন। তাহলেই মহান আল্লাহ আপনাদের নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে সর্বক্ষেত্রে দেশে শান্তির ফায়সালা করবেন। হে আল্লাহ, আমাদের শান্তির সুব্যবস্থা করুন। (আমিন)
লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, দৌলতগঞ্জ গাজীমুড়া কামিল মাদ্রাসা, লাকসাম, কুমিল্লা
মোবাইল: ০১৭১২৪৫১৬৩১
