সোমবার, ১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে যুবসমাজসহ শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা লাকসামে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক

<span class="entry-title-primary">ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে যুবসমাজসহ শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা</span> <span class="entry-subtitle">লাকসামে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক</span>
৬১ Views

            এম.এ মান্নান\ ভারত সীমান্ত দিয়ে আসা নিষিদ্ধ মাদকে সয়লাব হয়ে গেছে কুমিল্লার লাকসামে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে পৌর শহরসহ উপজেলায় মাদকের সহজলভ্যতায় শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা ঝুঁকে পড়ছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে তথা ফেসবুকের মেসেঞ্জারে অর্ডার দিয়ে বিকাশে টাকা পরিশোধ করে এ অঞ্চলে মাদক বেচাকেনা অতি সহজলভ্য হয়ে পড়েছে।

            এ উপজেলায় হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবা, গাঁজা ও বাংলামদসহ বিভিন্ন প্রকার মাদকদ্রব্য। মাদকের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এখন আসক্ত হয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসা ও সেবনে। মরণনেশা ইয়াবায় ডুবে থাকছে উপজেলার উচ্চবিত্ত থেকে নি¤œবিত্ত শ্রেণির হাজারো শিশু, কিশোর, তরুণ, যুবক ও বৃদ্ধ। মাদকাসক্তের কারণে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, পারিবারিককলহ, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই ও

খুনের মতো ঘটনাও  বেড়ে চলছে। আর এই মাদকের দিকে বেশি ঝুঁকছে উঠতি বয়সের ছেলেরা। এরই সঙ্গে তাদের মধ্যে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। নানা বাহানায় পরিবার থেকে টাকা নিয়ে জমায় রাতদিন মাদকের আড্ডা।

            মাদক সেবন যখন রুটিন নেশায় পরিণত হয়, তখন নেশা ছাড়া তাদের কোনো কিছুই মাথায় ধরে না। নেশার টাকা না পেলে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে অভিভাবকরাও উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠায় আছেন।

            জানা যায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অন্তরালে প্রতিনিয়ত রেলপথে  ও কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন সড়ক দিয়ে বিভিন্ন যানবাহন করে আসছে এসব মাদক। বর্তমানে মাদক পাচারের অন্যতম নিরাপদ রুট কুমিল্লা-চট্টগ্রাম রেলপথ। কুমিল্লা থেকে সহজেই ট্রেনে করে মাদক চলে আসে লাকসাম জংশনে। এরপর এখান থেকে কারবারিরা এসব মাদক এক স্পট থেকে অন্য স্পটে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

            এছাড়াও চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজারের কাশীনগর হয়ে পাশ্ববর্তী উপজেলা লালমাই

ভূশ্চি বাজার হয়ে লাকসাম রেলওয়ে জংশনে। তার পর এখান থেকে মনোহরগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলায় চলে যাচ্ছে মাদক। এক কথায় মাদকের নিরাপদ রুট হিসাবে মাদক ব্যবসায়ীরা এখন লাকসামকে ব্যবহার করছেন।

            উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ মাদক হেরোইন, চোলাই মদ, ইয়াবা ও গাঁজা, ফেনসিডিল অবাধে বিক্রি হচ্ছে। প্রকারভেদে প্রতিপিছ ইয়াবা প্রায় ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ও খুচরা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেকে ইয়াবা বহনের কাজে কোমলমতি ছাত্র ও নারীদেরও ব্যবহার করে রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

            খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যারা কিছুটা বিত্তশালী তারা ফেনসিডিলের দিকেই ঝুঁকে রয়েছেন। অপরদিকে ইয়াবা ও গাঁজার দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় এ দু’টি মাদকের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় বিভিন্ন স্পটে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ মাদক বিক্রেতাদের দেখা যায়। উপজেলার রেল চিতোষী, পরানপুর বাজার, কৈত্রা, বিজরা পূর্ব বাজার, মুদাফরগঞ্জ নগরীপাড়া, ধানকুইয়া, নাগঝাটিয়া, নোয়াপাড়া, শ্রীয়াং বাজার, সাতঘর ইছাপুরা, মোহাম্মদপুর, কৃষনপুর আশ্রয় প্রকল্প, চরবাড়ীয়া, নরাপাটি, ইরুয়াইন দক্ষিণ, কামড্যা, জংশন রেল কলোনী, দূপচর বাজার, খুন্তা, বরইগাঁও, পৌর এলাকার গাজিমুড়া, পেয়ারাপুর নদীর পাড়, বৌ বাজার, রাজঘাট, গন্ডামারা এলাকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্পটে প্রকাশ্যেই মাদকের বেচা-কেনা হচ্ছে।

            এদিকে সেবনের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এলাকায় চুরি ও ডাকাতির ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত ৩ মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য চুরি ও ডাকাতি সংঘটিত হয়েছে বলে জানা গেছে।

            মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ওয়ার্ডভিওিক  কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির মাধ্যমে সামাজিকভাবে মাদক বয়কট করার জন্য প্রত্যেক সভায় ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের নির্দেশ দেয়া হলেও গুরুত্ব দিচ্ছেন না কেউ।

            লাকসাম থানা সুত্রে জানা যায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মাদক ব্যবসায় ২০২৪  সালের আগষ্ট থেকে ২০২৫ সালের আগষ্ট পর্যন্ত গত ১ বছরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে ৩৪ জনের বিরুদ্ধে। অপরদিকে লাকসাম রেলওয়ে থানা সুত্র মতে, এ থানায় ২০২৪ সালে মাদক মামলা হয়েছে ৮টি, ২০২৫ সালে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মামলা হয়েছে ১৭টি।

            আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানে আটককৃতদের জেল হাজতে পাঠানো হলেও কয়েক দিন পর আইনের ফাঁক গলিয়ে জামিনে বেরিয়ে এসে হরহামেশাই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

            এলাকার সচেতন মহল নিষিদ্ধ মাদকের ভয়াবহ বিস্তারে চরম উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় রয়েছেন বলে তারা জানিয়েছেন।

            নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, ‘সোর্স পরিচয়ে উপজেলার বিভিন্ন মাদক স্পট থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেয়া হচ্ছে। সোর্সদের নিয়মিত টাকা ও মাদকদ্রব্য দিলে অভিযানের আগেই মাদক ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে দেয় তারা।’ ফলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযান ভেস্তে যাচ্ছে।

            পিস ফ্যাসিলিটেটর গ্রæপ (পিএফজি) লাকসাম শাখার অ্যাম্বাসেডর আলহাজ্ব মীর মোঃ আবু বাকার সিদ্দিক বলেন, মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত সবাই অল্পবয়সী। মাদকের ভয়াল নেশার ছোবলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের অল্পবয়সী যুবক ছেলেরা। ধ্বংস হচ্ছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরাও। মাদকাসক্ত সন্তানদের নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অভিভাবকরা।

            লাকসাম রেলওয়ে থানার (ওসি) জসিমউদ্দিন বলেন, ‘লাকসাম রেললাইনকেন্দ্রিক মাদকের সঙ্গে জড়িতদের ধরতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। প্ল­্যাটফর্মে নজরদারি রাখা হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের প্ল­্যাটফর্ম তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া, লাকসাম প্রবেশ ও বাইরের সময় প্রতিটি ট্রেনে তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদকের সঙ্গে জড়িতদের ধরতে আমরা সর্বদা তৎপর রয়েছি।

            এ বিষয়ে লাকসাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাজনীন সুলতানা বলেন, আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে আমরা যেখানেই মাদকের সন্ধান পাই আমাদের টিম সেখানেই ছুটে যায়। এছাড়া নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযানও পরিচালনা করছি। আমরা মাদক ব্যবসায়ী ও ছিচকে চোরদের গ্রেফতার করছি। আর সোর্সদের বিষয়ে আমরা আরও সতর্কাবস্থা অবলম্বন করছি।’

Share This

COMMENTS