সোমবার, ১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে বিপদজনক ৮৪টি ইউটার্ন

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা  অংশে বিপদজনক ৮৪টি ইউটার্ন
১০৬ Views

            নিজস্ব প্রতিনিধি\ চট্টগ্রাম বিভাগের জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কজুড়ে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করে হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়ন। বর্তমানে রিজিয়নের আওতায় রয়েছে ৮২১ কিলোমিটার সড়ক, যার মধ্যে ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়কও অন্তর্ভুক্ত। তবে প্রযুক্তি, জনবল ও যানবাহনের সক্ষমতা বাড়লেও সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না। বরং দিন দিন বাড়ছে প্রাণহানি।

            হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এ অঞ্চলে ২ হাজার ৬৪৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ২ হাজার ৩৬২ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ৯৭৯ জন। দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ১ হাজার ৯৭২টি এবং ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৪৭টি। এর মধ্যে সর্বাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০২৪ সালে (৬৩০টি)। ওই বছরেই প্রাণ হারান ৫২২ জন।

            ২০২০ সালে নিহত হন ২১০ জন, ২০২১ সালে ৪৪২ জন, ২০২২ সালে ৩৪৭ জন এবং ২০২৩ সালে ৪৪৯ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৪৯৩টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৩২৬ জন, আহত হয়েছেন ৬৩৪ জন এবং দুর্ঘটনা কবলিত যানবাহনের সংখ্যা ৬৭৮টি।

            সওজের তথ্যমতে, কুমিল্লা অংশের ১০০ কিলোমিটার সড়কে রয়েছে ৮৪টি বিপদজনক ইউটার্ন। যেখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। হাইওয়ে পুলিশ ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, উল্টোপথে চলাচল, পথচারীর অসচেতনতা, ফিটনেসবিহীন ও ক্রটিপূর্ণ যানবাহন, অতিরিক্ত গতি, অবৈধ পার্কিং, ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার না করা, সড়কপাশে বাজার স্থাপন, বেপরোয়া ড্রাইভিং এবং অদক্ষ চালকের কারণেই দুর্ঘটনা বাড়ছে।

            ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত অন্তত ১৪টি বড় বাজার যেমন ইলিয়টগঞ্জ, মাধাইয়া, চান্দিনা, সুয়াগাজী, নিমসার, মিয়াবাজার, চৌদ্দগ্রাম, বাবুর্চি, বারৈয়ারহাট, মিরসরাই, বাড়বকুন্ড, বাঁশবাড়িয়া ও ছোট কুমিরা বাজার। এসব হাটবাজারে পণ্য আনা-নেয়ার সময় ছোট যানবাহন সরাসরি মহাসড়কে উঠে পড়ে। পাশাপাশি কাঁচপুর মোড়, মদনপুর, ভাটেরচর, ক্যান্টনমেন্ট মোড়, বড় দারোগারহাট, কেডিএস ডিপো ও বিএম ডিপো এলাকায় সংযোগ সড়ক থেকেও ছোট যানবাহন নিয়মিত মহাসড়কে উঠে পড়ছে।

            এছাড়া, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ভটভটি, নসিমনসহ অনিবন্ধিত যানবাহন চলাচল করছে। এতে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে।

            দ্রæত ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ২০১৬ সালের ২রা জুলাই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১৯০ কিলোমিটার অংশ চার লেনে উন্নীত করা হয়। কিন্তু যানবাহনের অতিরিক্ত চাপের কারণে বর্তমানে সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় সম্প্রতি একটি লরি উল্টে প্রাইভেটকার চাপা পড়ে একই পরিবারের চারজন নিহত হন।

            হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অপরাধ দমন ও দুর্ঘটনায় সঠিক কারণ নির্ণয় করতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৪৯০টি পোলের মাধ্যমে ১ হাজার ৪২৭টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। প্রায় ১৫২ কোটি টাকার এই প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে এডিবি। ক্যামেরাগুলো অপরাধ শনাক্ত করে কন্ট্রোলরুমে সতর্ক সংকেত পাঠানোর সক্ষমতা রাখলেও এখন অনেক ক্যামেরাই বিকল। গত বছরের জুলাই মাসে আন্দোলনের সময় বহু ক্যামেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সময়মতো মেরামত না হওয়ায় এর কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

            কুমিল্লা পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক কবির আহমেদ বলেন, ‘ফোরলেন সড়কে আলাদা লেন না থাকায় মোটরসাইকেল ও নিষিদ্ধ ছোট যানবাহন বড় গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে, এতে দুর্ঘটনা বেড়েছে। চালকরা আইন মানছে না, জরিমানা করেও কার্যকর ফল পাওয়া যাচ্ছে না।’

            বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘পরিবহন খাত রাজনৈতিক প্রভাব ও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনীতিক ও প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তারা এখানে জড়িত। চালকের লাইসেন্স, রোড পারমিট, ফিটনেস এসবের সঙ্গে যারা আইন প্রয়োগ করে, তারাই অনেক সময় সুবিধাভোগী হয়ে পড়ে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরলে চাঁদাবাজি ও অবৈধ সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই বিশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই অনেকেই আগ্রহী। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি এখন চারলেন আছে। তবে অধিকাংশ সময় দেখা গেছে এই সড়কটির দুই পাশে পার্কিং হয়ে যায়, হাটবাজার দিয়ে মহাসড়কের দুই পাশ দখল করে রাখা হয়, এই বিশৃঙ্খলার কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে।’

            হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়নের অধীনে বর্তমানে ২২টি থানা রয়েছে, যেখানে প্রায় ৭০০ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজ করছেন। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

            কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন, ‘দুর্ঘটনা ঘটছে নানা কারণে- কিছু চালকের অসাবধানতা, কিছু সড়ক অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি আইন প্রয়োগে, কিন্তু জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্টের ঘাটতি একটি বড় সমস্যা। ৫ই আগস্টের ঘটনায় আমাদের অনেক গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এখনও আমরা নতুন গাড়ি পাইনি।’

            তিনি আরো বলেন, ‘মহাসড়কে ছিনতাই, ডাকাতি ও দুর্ঘটনা রোধে সিসি ক্যামেরা অত্যন্ত কার্যকর। প্রকল্পটি পুরোপুরি হস্তান্তর হলে দুর্ঘটনা ও অপরাধ দমনে হাইওয়ে পুলিশ আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।’ -কালেরকন্ঠের সৌজন্যে

Share This