মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নেই


ইলিয়াজ হোসেন রানা
শিক্ষা হলো একটি জাতির মেরুদন্ড। উন্নত, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষার মূল লক্ষ্য শুধু তথ্য অর্জন নয়; বরং ব্যক্তির মধ্যে চিন্তাশক্তি, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও নৈতিকতা গড়ে তোলা। এই গুণাবলি অর্জনের ক্ষেত্রে শিক্ষক হচ্ছেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একজন দক্ষ, নিবেদিতপ্রাণ ও দূরদর্শী শিক্ষক শিক্ষার গুণগত মানউন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেন। তাই বলা যায়, শিক্ষার মান নির্ভর করে মূলত শিক্ষকের মনের উপর। একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে চিনে তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। তিনি শিক্ষার্থীকে শুধু পেশাগতভাবে নয়; মানবিক ও সামাজিকভাবে সক্ষম করে তুলতে সাহায্য করেন। ফলে সমাজে দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি হয়, যা একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
প্রকৃতপক্ষে ‘শিক্ষক জাতির বিবেক’ এ কথাটি শুধু একটি প্রবাদ নয়, বরং একটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো গঠনের মূল দর্শন। একজন শিক্ষকই জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাতা; তিনি তরুণ প্রজন্মকে জ্ঞান, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের পাঠ দেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আজ সেই জাতিনির্মাতারা নিজেরাই অবমূল্যায়নের শিকার। শিক্ষকের প্রতি সমাজ ও রাষ্টে্রর আর্থিক ও সামাজিক অবহেলা দিন—দিন তাদের পেশার মর্যাদা কমিয়ে দিচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার গুণগত মানের উপর। এক সময় শিক্ষক ছিলেন সমাজের অন্যতম শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। প্রাচীন ভারতীয় গুরুগৃহ বা মধ্যযুগীয় মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক ছিলেন সমাজের পথপ্রদর্শক। শিক্ষার্থীরা শুধু জ্ঞান নয় চরিত্র গঠনের দীক্ষাও পেত শিক্ষকের কাছ থেকে। আধুনিক সমাজে, বিশেষত অর্থনৈতিক বাস্তবতায়, শিক্ষকের প্রতি সেই শ্রদ্ধা ও মূল্যবোধ ধীরে ধীরে ক্ষুণ্ণ হয়ে যাচ্ছে। এখন শিক্ষকপেশা অনেক সময়েই ‘শেষ বিকল্প’ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা সমাজে একটি দুঃখজনক মানসিকতার প্রতিফলন। সমাজ যখন ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ বা ক্রীড়াবিদদের বেশি সম্মান ও পারিশ্রমিক দেয়, অথচ শিক্ষককে অবহেলিত রাখেÑ তখন নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসতে হীনমন্যতায় ভোগে। আগে শিক্ষককে অভিভাবকের সমমর্যদা দেয়া হতো। এখন সেই সম্পর্কেও শিথিলতা এসেছে। অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের অভিভাবক বা সমাজ শিক্ষককে তুচ্ছভাবে দেখছেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষককের প্রতি অবমাননাকর আচরণ বা হামলায় ঘটনাও ঘটে থাকে। এই প্রবণতা শুধু শিক্ষকের মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ণ করছে না; এটি শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিতকেও নড়বড়ে করে তুলছে। নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এ অবস্থা আরও জটিল। অনেক সময় তারা বেতনবৈষম্যের শিকার হন, মাতৃত্বকালীন ছুটি বা নিরাপত্তা সুবিধা পান না। এমন অবস্থায় নারী শিক্ষকরা সামাজিক ও পারিবারিক চাপের কারণে পেশাগত জীবনে পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে পারেন না। এর ফলে বিদ্যালয়ের পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেও ব্যাঘাত ঘটে।
একটি দেশের শিক্ষার মান নির্ভর করে মূলত দু’টি বিষয়ের উপরÑ শিক্ষকের মান ও তার কর্মপরিবেশর উপর। শিক্ষক যদি মানসিকভাবে স্বস্তিতে থাকেন, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হন, তবে তিনি শিক্ষার্থীর বিকাশে সর্বোচ্চ অবদান রাখতে পারেন। কিন্তু নিম্ন বেতন কাঠামো শিক্ষকের মনোবল ভেঙে দেয়, সৃজনশীলতা হ্রাস করে, এমনকি অনেক সময় তাকে বিকল্প জীবিকার দিকে ঠেলে দেয়। যখন শিক্ষক নিজের সংসার চালাতে হিমশিম খান, তখন তার পক্ষে শিক্ষার্থীদের প্রতি নিবেদিতভাবে সময় দেয়া, নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করা বা প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থবিরতা আসে, শিক্ষার গুণগতমান কমে যায়।
বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকরা তুলনামূলকভাবে সবচাইতে কম বেতন পান। অনেক বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম। এমনকি সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবীদের তুলনায় পদমর্যাদা ও সুবিধার দিক দিয়ে পিছিয়ে। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রায়ই অভিযোগ করেন যে, তাদের বেতনে সংসার চালানোই কষ্টকর। ফলে তারা বাধ্য হয়ে প্রাইভেট টিউশন, কোচিং বা অন্য পার্শ্ব আয়ের উপর নির্ভর করতে হয়। এতে শিক্ষকতার পবিত্রতা ও একাগ্রতা ক্ষুণ্ণ হয়। পাঠদান হয় দায়িত্বের চেয়ে পেশাগত চাপের কারণে, যা শিক্ষার মানের জন্য ক্ষতিকর।
আধুনিক শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষা পদ্ধতিতেও পরিবর্তনে এসেছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় একজন শিক্ষককে শুধু জ্ঞানের বাহক হিসেবে নয়, বরং শিখন—প্রক্রিয়ার পরিচালক হিসাবে কাজ করতে হয়। সেই জন্য প্রয়োজন নিয়মিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, সেমিনার ও পেশাগত উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ। প্রশিক্ষিত শিক্ষক শিক্ষার্থীর শিখার আগ্রহ বাড়াতে পারেন, পাঠদানকে আকর্ষণীয় করতে পারেন, এবং শিক্ষার্থীর মানসিক ও আবেগিক বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারেন। গুণগত শিক্ষার জন্য পাঠদান পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য ও নতুনত্ব আনা জরুরি। শুধু মুখস্থনির্ভর শিক্ষা নয় বরং শিক্ষার্থী কেন্দি্রক ও অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে। শিক্ষক যদি প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, আলোচনা, দলীয় কার্যক্রম, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলপ্রশ্ন ইত্যাদি ব্যবহার করেন, তাহলে শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পায়। এভাবে শিক্ষক—শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও সৃজনশীলতা গড়ে তুলতে পারে। এছাড়াও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন আধুনিক শিক্ষক মাল্টিমিডিয়া ক্লাস, অনলাইন রিসোর্স ও ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহার করে, পাঠদানকে আকর্ষণীয় ও ফলপ্রসূ করতে পারেন। কিন্তু নিম্নবেতনভুক্ত শিক্ষকরা প্রায়ই নিজেদের অর্থে প্রশিক্ষণ নেয়া বা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পান না। ফলে তারা পুরনো পদ্ধতিতেই আটকে থাকেন, যা শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়নে বড় বাধা সৃষ্টি করে। একসময় শিক্ষকতা ছিল সমাজের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পেশা। কিন্তু আজ নিম্ন বেতন ও আর্থিক দুরবস্থার কারণে অনেক শিক্ষক সামাজিকভাবে অবমূল্যায়িত হচ্ছেন। সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা কমে গেলে শিক্ষার্থীর কাছেও সেই পেশা অনুপ্রেরণার উৎস থাকে না। শিক্ষার গুণগতমান শুধু বই—পুস্তকের জ্ঞান নয়; এর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ, নৈতিক শিক্ষা, সৃজনশীলতা ও মানবিকতা। শিক্ষক যদি এসব বিষয়ে যথেষ্ট সময়, মনোযোগ ও আন্তরিকতা দিতে না পারেন তাহলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। নিম্ন বেতনকাঠামো শিক্ষকদের মধ্যে এই ধরনের আর্থিক অনিরাপত্তা তৈরি করে, যা তাদের পেশাগত দায়িত্ব ও মনোযোগকে ব্যাহত করে। ফলস্বরূপ শিক্ষার্থীরা পাঠদানে আগ্রহ হারায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিতি বেড়ে যায় এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান নিম্নগামী হয়।
বলা বাহুল্য, বেশ কিছু উন্নত দেশ যেমন ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান বা কানাডায় শিক্ষকদের বেতন কাঠামো অন্যান্য পেশার তুলনায় অনেক উঁচু। সেখানে শিক্ষকতা একটি গৌরবের পেশা, ফলে যোগ্য ও মেধাবীরা এতে আগ্রহী হন। ফিনল্যান্ডে শিক্ষক হতে হলে কঠিন যোগ্যতা ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে একবার নির্বাচিত হলে, তাদের বেতন, সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। এর ফলেই সেই দেশের শিক্ষার মান আজ বিশ্বের সেরা। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক দেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে শিক্ষকরা বেতন বৈষম্যের শিকার। তাই এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনো গুণগত উন্নয়ন দৃশ্যমান নয়। যদিও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা একটি বড় কারণ, তবুও শিক্ষার মান নিম্ন হওয়ার পিছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে, প্রশাসনিক অদক্ষতা, পাঠ্যক্রমের পুরনো ধাঁচ, শিক্ষার প্রতি সামাজিক অনাগ্রহ ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রভৃতি কারণগুলোও শিক্ষার গুণগত মানে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা দূর করার পাশাপাশি নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে, শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি ও সঠিক ব্যয়ের নিশ্চয়তা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা বৃদ্ধি, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও উপবৃত্তি কর্মসূচি, সরকারি—বেসরকারি অংশীদারত্বে শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প এবং প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, গণমাধ্যম, শিক্ষানীতি ও সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে শিক্ষককে জাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, যোগ্য, সৎ ও মেধাবী ব্যক্তিদের শিক্ষকতায় আগ্রহী করতে স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা ও পেশাগত সম্মান বজায় রাখা প্রভৃতি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো শিক্ষকদের বেতন কাঠামো অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, বেতন ও প্রণোদনা একান্তভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য। শিক্ষার গুণগতমান বাড়াতে হলে শুধু শিক্ষা প্রকল্প বা পাঠক্রম পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা, পেশাগত মর্যাদা ও কর্মপ্রেরণা নিশ্চিত করতে হবে। এক কথায়, শিক্ষকরা শিক্ষার মূলধন; তাদের সঠিক মূল্যায়ন ও সম্মান দিয়ে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করলে দক্ষিণ এশিয়া শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে সক্ষম হবে।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট।
