কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় রাস্তা ও ব্রিজের নির্মাণ-সংস্কার কাজ বন্ধ রাখায় অর্ধশতাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সম্পাদিত চুক্তি বাতিল

ষ্টাফ রিপোর্টার\ কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলায় রাস্তা ও ব্রিজের নির্মাণ-সংস্কার কাজ বন্ধ রাখায় এলজিইডি কুমিল্লার অধীন অর্ধশতাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানকে সাড়ে ৮ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া দেরিতে কাজ সম্পন্ন করায় দেড় শতাধিক ঠিকাদারকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা বিলম্বজনিত জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এদিকে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবহেলা ও অসমাপ্ত কাজের কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণকে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কুমিল্লা কার্যালয় সূত্রে এ সব তথ্য জানা গেছে।
এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত সরকারের সময়ে জেলায় ব্রিজ-কালভার্ট ও সড়ক নির্মাণসহ সংস্কারের জন্য বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। কিন্তু অধিকাংশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজের চুক্তি সম্পাদন করার পরও অদ্যাবধি চুক্তি অনুযায়ী কাজ শুরুই করেনি। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করলেও সামান্য কাজের পর ফেলে রেখেছেন। কেউবা চুক্তি অনুযায়ী সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় নানা অজুহাতে একাধিকবার সময় নিয়েও কাজের সিকিভাগও করেনি। গ্রামীণ পর্যায়ে এ সব গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ শুরু কিংবা সময়মতো সম্পন্ন না হওয়ায় ও কাজ ঝুলে থাকায় জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
এ অবস্থায় এলজিইডি কর্তৃপক্ষ কাজ শুরু না করায় এরই মধ্যে অর্ধশতাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করেছে এবং দেরিতে কাজ সম্পন্ন করায় দেড় শতাধিক ঠিকাদারকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা জরিমানা করেছে। এদিকে, প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে এলজিইডির চারটি বড় প্রকল্পে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
সূত্র জানায়, ৬৬ কোটি ৮৭ লাখ ৩১ হাজার ৪০২ টাকা ব্যয়ে জেলার দাউদকান্দি উপজেলার বাতাকান্দি-কদমতলী থেকে হাসনাবাদ পর্যন্ত ৫৭০ মি. গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের কাজ পায় যশোরের মো. মইনউদ্দিন বাসী লি: -মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ (জেভি)। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের ২৬শে জুলাইয়ের মধ্যে কাজটি শুরু করে ২০২৩ সালের ১৮ই মে তারিখের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু চুক্তি সম্পাদনের পর প্রায় সাড়ে ৫ বছর অতিবাহিত হলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ। এখনো ওই ব্রিজের একটি পাইলের কাজও শুরু করা হয়নি।
এছাড়া, ৩ কোটি ৮১ লাখ ২৫ হাজার ৪৩৪ টাকা ব্যয়ে জেলার বুড়িচং উপজেলার চড়ানল-নগরপাড় রাস্তায় ২৭ মি. দীর্ঘ আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের কাজ পায় ভোলার মো. ইকবাল হোসেন-মেসার্স শশী এন্টারপ্রাইজ (জেভি)। ওই ব্রিজের ২২টি পাইলের মধ্যে ১১টি পাইলের কাজ করা হয়। এ কাজের ল্যাবরেটরিতে লোড টেস্ট রিপোর্টে গুণগত মান সঠিক না হওয়ায় তাদের বিল আটকে দেয় এলজিইডি কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ব্রিজের নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে।
এদিকে, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অধীন লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলায় মোট ১৯টি প্যাকেজে ৬৭.০৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৫৮টি নতুন রাস্তা নির্মাণের জন্য ঢাকার ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে সব কাজ শেষ করার কথা ছিল।
এরই মধ্যে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও ৩টি রাস্তার কাজ এখনো শুরু করা হয়নি, চারটি রাস্তার কাজ এগিয়েছে সিকি ভাগ এবং ১১টি রাস্তার গড় অগ্রগতি হয়েছে ৬৫ শতাংশ।
এছাড়া, ১ কোটি ১৬ লাখ ২৮ হাজার ৫৩০ টাকা ব্যয়ে মুরাদনগর উপজেলার মালিপাড়া-পূর্বধইর সড়ক ভায়া নবীয়াবাদ মাদ্রাসা সড়ক কার্পেটিং দ্বারা উন্নয়ন কাজ পায় কুমিল্লার মেসার্স এমএম কন্সট্রাকশন। চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের গত ৬ই আগস্ট কাজ শেষ করার কথা ছিল কিন্তু ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি শুরু না করায় গত ৫ই অক্টোবর চুক্তিটি বাতিল করে ১০ পার্সেন্ট টাকা জরিমানা করা হয়।
এলজিইডি কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মতিন বলেন, কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চুক্তিবদ্ধ সময় অতিক্রান্ত হলেও কাজ শুরু করেনি। এছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে কাজের ২৫ ভাগও সম্পন্ন করেনি। অনেক প্রতিষ্ঠান অঙ্গীকারনামা দিয়ে সময় বৃদ্ধি করে নেয়ার পরও কাজ আটকে রেখেছেন। আবার কেউ কেউ অত্যন্ত নি¤œমানের কাজের কারণে নির্মিত ব্রিজ ও রাস্তার কাজ ভেঙে অপসারণ করা হয়েছে। এমন অবস্থার কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষকে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তাই কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা অসন্তুষ্ট হলেও বেশিরভাগ ঠিকাদার কাজের গতি বাড়িয়ে দ্রæত কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন।
