বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ঘন কুয়াশার সুযোগে গভীর রাতে লুট হচ্ছে গোমতীর মাটি

ঘন কুয়াশার সুযোগে গভীর রাতে লুট হচ্ছে গোমতীর মাটি
৪৩ Views

            শাহীন আলম\ ২০২৪ সালের ২২শে আগস্ট রাতে বুড়িচং উপজেলার বুড়বুড়িয়া গ্রামে গোমতী নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছিল বুড়িচংসহ ৫টি উপজেলা। ওই বন্যায় প্রায় দেড় মাস পানিবন্দি ছিলেন লাখ লাখ মানুষ। পরে সাড়ে ৩ মাস ধরে সেনাবাহিনীর তত্ত¡াবধানে ভাঙা বেড়িবাঁধ মেরামত করা হয়। ভয়াবহ ওই বন্যার ক্ষতচিহ্ন এখনো বুড়িচংসহ বিভিন্ন স্থানে রয়ে গেছে।

            গোমতী নদীর দু’পাড়েই আছে বেড়িবাঁধ। ২ বাঁধের মধ্যে নদী এখন শুকিয়েছে। জেগেছে চরের পর চর। নদীর বুকে জেগে ওঠা এসব চরের মাটি প্রতি রাতের অন্ধকারে কেটে লুট করে নিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন চক্র।

            সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দেবীদ্বার, ল²ীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় চরের শতাধিক স্থানে এই লুট চলছে।   জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অভিযান চালিয়ে এসব চক্রের সদস্যদের মাঝেমধ্যে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তারা জেল খেটে বা জরিমানা দিয়ে আবারও একই অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। মাটি লুটের কাজটি সাধারণ শ্রমিকদের দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে এসব চক্র। ফলে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন হোতারা।

            জানা গেছে, নদীর মাটি লুট করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কুমিল্লা জেলার ২ শতাধিক ইটভাটায়। গোমতী নদীর পাড় ঘুরে দেখা গেছে, শতাধিক স্থানে রাতের আঁধারে লুট করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মাটি। বেড়িবাঁধ কেটে উঠানামা করছে শত শত মাটিবোঝাই ট্রাক্টর ও ডাম্প ট্রাক। এই শীত মৌসুমে এসব চক্র বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

            নদীর দু’পাশের বাঁধ কেটে মাটিবোঝাই ট্রাক্টর চলাচলে ধুলাবালি ও শব্দদূষণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে নদীপাড়ের বাসিন্দারা। এছাড়া হুমকির মুখে পড়েছে কৃষকের ফসলি জমি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, পাকা সড়ক ও বেশ কিছু সেতু।

            গোমতী পাড়ের কয়েকজন কৃষক বললেন, দিনের দৃশ্য যেমন তেমন, রাতে চলে ‘মাটি ডাকাতির’ কাজ। সন্ধ্যা নামার পরই শুরু হয় শত শত ট্রাক্টর ও ডাম্প ট্রাকের চলাচল। এখন আমরা জমি ও ফসল নিয়ে আতঙ্কে আছি। কখন যে কার জমি ডাকাতদের কবলে পড়ে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাটি লুট চক্রের হোতাদের মধ্যে রয়েছেন, দেবীদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম, কালিকাপুর-নয়াপাড়ার শিষন মিয়া ও দুলাল মিয়া,  বানিয়াপাড়ার পলাশ, খলিলপুরের হেলাল ও জয়পুরের জহির। তাঁদের নির্দেশে রাতের আঁধারে মাটি কেটে ছুগুরা গ্রামের লিমা ব্রিকস ও কালিকাপুরের এমএমবি ব্রিকসসহ কমপক্ষে ২০টি ইটভাটায় মাটি নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক দিন রাতে দেবীদ্বার উপজেলার ল²ীপুরে গিয়ে দেখা গেছে, গোমতী নদীর বেড়িবাঁধের মোড়ে ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি আসছে কি না তার পাহারা দিচ্ছেন লোকজন। চক্রের এমন একজন সদস্যের কাছ থেকে কৌশলে জানা গেল, মাটি কাটা পর্যন্ত প্রতি রাতের পাহারায় ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা করে দেয়া হয় তাদের। পাহারাদার চক্রের কাজ শুধু অভিযান বা ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি দেখলে চক্রের হোতাদের খবর পৌঁছে দেয়া। এতে অভিযানের সময় মাটি কাটায় জড়িতদের কাউকে না পাওয়া গেলেও ট্রাক্টর ফেলে পালিয়ে যান শ্রমিকরা। পরে বাধ্য হয়ে ট্রাক্টর জব্দ করে থানায় নিতে বাধ্য হন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

            কুমিল্লা আদর্শ সদর এলাকা, বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, একই চিত্র। এসব উপজেলার শতাধিক ইটভাটায় গোমতীর চরের মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে। গোমতী বেড়িবাঁধের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার টিক্কাচর, ছত্রখীল, পালপাড়া, দুর্গাপুর, আমতলী, কাচিয়াতলী, বুড়িচং, বাবুবাজার, বাজেবাহেরচর, পূর্বহুরাসহ আশপাশের এলাকায়ও নদীর মাটি কেটে নিতে দেখা গেছে।

            কুমিল­া জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গোমতীর উৎপত্তিস্থল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উদয়পুরে। এই নদীটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কটকবাজার দিয়ে। পরে জেলার আদর্শ সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবীদ্বার, মুরাদনগর, তিতাস ও দাউদকান্দি উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তা মেঘনায় গিয়ে মিশেছে। বাংলাদেশ অংশে এ নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৯০ কিলোমিটার। নদীর ডান তীরে ৪১ কিলোমিটার ও বাঁ তীরে ৩৪.৭৫ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে।

            দেবীদ্বার উপজেলার খলিলপুর, বিনাইপাড়, চরবাকর, বড় আলমপুর, চান্দপুর, ল²ীপুর, কালিকাপুর-নয়াপাড়া এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাতের আঁধারে ট্রাক্টরগুলো ছুটছে নদীর চরের দিকে, নদীর দু’পাশে লাগামহীন কেটে নেয়া হচ্ছে কৃষিজমির মাটি। ট্রাক্টরের শব্দ আর ধুলোয় অতিষ্ঠ গোমতীর পাড়ের মানুষ। তবে এসব এলাকায় দিনের বেলায় কাউকে মাটি কাটতে দেখা যায় না।

            খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার আদর্শ সদর, দেবীদ্বার, মুরাদনগর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া ও তিতাস অংশে বিভিন্ন চক্র মাটি লুট করছে। চরের জমির মাটি কিনে ২০ থেকে ৪০ ফুট গভীর পর্যন্ত মাটি কেটে নেয়। পাশের জমি নিচে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিলে পার্শ্ববর্তী জমির মালিককেও চক্রের সদস্যরা মাটি বিক্রি করতে বাধ্য করেন। অনেক কৃষক নিরুপায় হয়ে নামমাত্র মূল্যে মাটি বিক্রি করতে বাধ্য হন।

            দেবীদ্বারের ল²ীপুরের গোমতী চরের কৃষক শহীদুল ইসলাম, খলিল ও চরবাকরের শামসুল হক বলেন, কিছু রাজনৈতিক নেতার আশ্রয়ে এসব মাটি জেলার অর্ধশতাধিক ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে।

            দেবীদ্বার উপজেলার বড়আলমপুর গ্রামের (অব.) সার্জেন্ট নাছির বলেন, ‘একসময়ে এই চরে বিঘার পর বিঘায় চাষবাস হতো। বর্তমানে নদীর চর খাঁ খাঁ করছে। কয়েক দিন পর পর অভিযানে ২-১ জন শ্রমিক আটক হলেও যারা মূল হোতা তারা ধরে পড়ে না।

            আদর্শ সদর উপজেলার টিক্কার চরের কৃষক মো. সিরাজুল ইসলাম ও আবু হানিফ, দেবীদ্বারের চরবাকর গ্রামের মনু মিয়া, খলিলপুর গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন ও শরিফুল ইসলাম জানান, রাতে মাটি কাটা শুরু হয়, চলে ভোর পর্যন্ত। এই চরে সবজি ফলিয়ে রুটি রুজি করতেন কৃষকরা, আজ তারা পথে বসেছেন। জোর করে মাটি কেটে নিচ্ছে, বাঁধা দিলে মারধর করে।

            মাটি লুটপাটকারীচক্রের হোতাদের একজন জাফরগঞ্জের সিরাজুল ইসলাম বলেন, মাটি না কাটলে ইটভাটা কিভাবে চলবে?

            বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা শাখার সভাপতি ডা. মোসলেহ উদ্দিন বলেন, ‘মাটিখেকোরা অভিনব কায়দায় রাতে মাটি কাটছে, রাতে তো আর ম্যাজিস্ট্রেট যান না। এটি যদি জেলা প্রশাসন বন্ধ না করতে পারে তাহলে গোমতীর ভবিষ্যৎ খুব খারাপ পর্যায়ে পৌঁছবে।’

            কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাশেদ শাহারিয়ার বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিগ্রহণকৃত ভূমিতে মাটি কাটার কারণে আমরা দেবীদ্বার থানায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছি।

            কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, ‘গোমতী নদীর চরের মাটি কাটার বিষয়টি প্রতিরোধে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। গোমতী চর ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলায় মাটি কাটার সঙ্গে জড়িতদের জেল জরিমানা করা হচ্ছে।  আমরা তথ্য পেলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করছি, মাটি বহনে ব্যবহৃত যানবাহন জব্দ করছি।’

Share This