আতঙ্কে তেল কেনা, ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন: নিয়ন্ত্রণে হিমশিম সরকার

দেশে জ্বালানি তেলের বাড়তি চাহিদা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না সরকার। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কিছুটা বেশি অকটেন সরবরাহ করা হলেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে মোটরসাইকেল ও গাড়িচালকদের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেককে রাতভর অপেক্ষা করে তেল সংগ্রহ করতেও দেখা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা শুরু হয়েছে। এতে বাজারে কৃত্রিমভাবে চাহিদা বেড়ে গেছে, যা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, অনেকেই মজুত করার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনছেন। জেলা পর্যায়ে ফুয়েল কার্ড চালুর মাধ্যমে কিছুটা ভিড় কমানো সম্ভব হয়েছে। ঢাকাতেও শিগগিরই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। পাশাপাশি ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, ৬ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ২২৮ টন, পেট্রলের মজুত ১৬ হাজার ৩০ টন এবং অকটেনের মজুত ১০ হাজার ৫২৬ টন। তবে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির পর থেকেই বাজারে অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দৈনিক ডিজেল সরবরাহ ১০ শতাংশ এবং পেট্রল সরবরাহ ১৫ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে অকটেন সরবরাহ বেড়েছে ২ শতাংশ। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৯ টন বেশি অকটেন বিক্রি হয়েছে।

মার্চ মাসে প্রতিদিন গড়ে পেট্রল বিক্রি হয়েছে ১,২৭১ টন এবং এপ্রিলেও প্রায় একই হারে বিক্রি হচ্ছে। অকটেন বিক্রি মার্চে গড়ে ১,২২২ টন হলেও এপ্রিল মাসে কিছুটা কমে ১,১১৪ টনে নেমেছে। আগামী সপ্তাহে সরবরাহ আরও বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তব চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত কেনা ও বাইরে বিক্রির কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উত্তরার একটি পাম্পের ব্যবস্থাপক জানান, আগে যেখানে সারাদিনেও ১৮ হাজার লিটার অকটেন বিক্রি হতো না, এখন মাত্র চার ঘণ্টায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। একই ব্যক্তিদের একাধিকবার তেল নিতে দেখা যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেট্রল ও অকটেনের প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই। তাই সরবরাহ আরও বাড়ানো এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয় করা যেতে পারে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কিউআর কোডভিত্তিক বিক্রয় ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম. তামিম। তাঁর মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মানুষের ভীতি কমবে না, ফলে অতিরিক্ত কেনার প্রবণতাও চলতে থাকবে। তবে রেশনিং ও প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।

এদিকে পেট্রলপাম্প মালিকদের অভিযোগ, কোথাও বেশি আবার কোথাও কম তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে পদ্মা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান জানিয়েছেন, গত বছরের তথ্যের ভিত্তিতে চাহিদা মূল্যায়ন করে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে, ফলে বৈষম্যের সুযোগ নেই।

সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলায় ফুয়েল কার্ড চালু করেছে। পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার মতো কিউআর কোডভিত্তিক বিক্রয় ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাজারে অতিরিক্ত চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *