
হাসান-উজ-জামান\ কথিত ও ভুয়া সাংবাদিকদের চাঁদাবাজি এখন এক সামাজিক ব্যাধিতে পরিনত হয়েছে। নামসর্বস্ব পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল বা আইপি টিভির কার্ড গলায় ঝুলিয়ে একটি চাঁদাবাজচক্র নিজেদের সাংবাদিক পরিচয়ে সর্বত্র বিচরণ করছে। সরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এমনকি সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ই এদের প্রধান কাজ। ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ট্রাক ড্রাইভার এমনকি রিকশাচালক পর্যন্ত এদের অত্যাচারে চরম অতিষ্ঠ। এ ধরনের ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্যের কারণে মূলধারার পেশাদার সাংবাদিকরা বিব্রত হচ্ছেন। ভুয়া চক্রের সদস্য রয়েছে কিছু সুন্দরী তরুণীও। বøাকমেইলে সিদ্ধহস্ত এদের দিয়েও করানো হচ্ছে নানা অপকর্ম। যে মহান পেশা সব শ্রেণি-পর্যায়ের ঘুষ-দুর্নীতি, অনিয়ম, বিভ্রান্তি, অসংগতির বিস্তারিত তুলে ধরে এখন সে পেশার নাম ভাঙিয়ে চলছে ভয়ংকর চাঁদাবাজি। যে কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাটিও। পুলিশ বলছে, ভুয়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই বিশেষ অভিযান চালানো হবে। অন্যদিকে, পেশাদার সাংবাদিক নেতারা বলেন, শুধু পুলিশকে উদ্যোগ নিলেই হবে না। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিক ইউনিয়নকে ভুয়া সাংবাদিক চিহ্নিত করতে ব্যবস্থা নিতে হবে। সাংবাদিক নামের চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য রুখতে শুধু প্রশাসন নয়; সমাজের সবাইকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে আক্ষেপ করে জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে অফিস চলাকালীন সময়ে দৈনিক গড়ে একশ’ ভুয়া সাংবাদিক আসেন। এদের অত্যাচার এমন পর্যায়ে ঠেকেছে, অফিশিয়াল কাজে অনেক বিঘœ ঘটছে। বিভিন্ন বাহানায় এরা কর্মকর্তা কিংবা স্টাফদের সাথে কথা বলতে চায়। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা প্রশ্ন রাখতেই সাংবাদিক ভিজিটিং কার্ড বের করে দেখান। তখন ওই কর্মকর্তা বলেন, এসব কার্ডে উল্লেখিত পত্রিকা কি কখনো প্রকাশিত হয়? অথচ এসব পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয়ে টাকা দাবি করে। এদের কারণে আমরা খুবই বিব্রত।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গণমাধ্যম কর্মী পরিচয়ে এভাবেই ভয়াবহ প্রতারণা চলছে। অভিযোগ রয়েছেÑ তারা পত্রিকায় মিথ্যা খবর ছাপানোর ভয় দেখিয়ে মানুষকে বø্যাকমেইল করে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা-পয়সা। কেউ কেউ থানা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেক্টরে করছে দালালি। আবাসিক হোটেল থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকায় বাসা-বাড়িতে দেহ ব্যবসার ফ্ল্যাট, ফুটপাত, গাড়ি, ফলের ও মাছের আড়ত পলিথিনের আড়তেও চাঁদাবাজি করছে সাংবাদিক নামধারী এই চক্র। আবার টেলিভিশনে চেহারা দেখিয়ে নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে জাহির করতে এরা বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে নির্ধারিত সময়ের আগে গিয়েই সামনের সারিতে বসে থাকেন। দৃষ্টিকটু হলেও এরা বেহায়ার মতো বসে থাকে। সংবাদ সম্মেলন শেষে এরা ভুক্তভোগীকে ঘিরে ধরে নিউজ করার প্রতিশ্রæতি দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এমনকি খাবার নিয়েও কাড়াকাড়ি করে।
শুধু তাই নয়; খোদ রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় গত ২৪শে জুন সাংবাদিক পরিচয়ে রিকশাচালকদের থেকে টাকা তোলার সময় সজীব পাঠান স¤্রাট নামে এক প্রতারক যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ। ডিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) নিয়াজ মেহেদী জানান, গ্রেফতারকৃত স¤্রাট এক ব্যক্তির কাছ থেকে সাংবাদিক পরিচয়ের একটি আইডি কার্ড সংগ্রহ করেন। ওই কার্ড ব্যবহার করে সাংবাদিক পরিচয়ে বিভিন্ন অজুহাতে রিকশাচালকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছিলেন।
গত ১লা জুলাই শার্শা উপজেলা ইউএনও এবং একই থানার ওসির কাছে পৃথক দু’টি অভিযোগ করেন স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী। অভিযোগের উল্লেখ করা হয়, গত ২৯শে জুন বসতপুর এলাকায় সাংবাদিক পরিচয়ে ৪ ব্যক্তি একটি বেকারিতে প্রবেশ করে মালিক আবুল হোসেনের কাছে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন এবং কোনো অনুমতি ছাড়াই বেকারির ভেতরে প্রবেশ করে ছবি ও ভিডিও ধারণ শুরু করেন। বেকারি মালিক চাঁদা দিতে অস্বিকার করায় ইউএনওকে দিয়ে বেকারি বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেন। একপর্যায়ে ৩ হাজার টাকা চাঁদা নিয়ে তারা চলে যায়। বাকি ৭ হাজার টাকা বিকাশ নম্বরে দ্রæত পাঠানোর হুমকি দেয়া হয়।
সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি ও অপসাংবাদিকতা বন্ধে এর আগে গত বছরের নভেম্বরে বরিশালে ঐক্যবদ্ধ ৩৫ সংগঠন সভা করেন। সেখানে অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করার দায়িত্ব সকলের উল্লেখ করে তারা ঐক্যবদ্ধ হন। তবুও থেমে নেই সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি।
এসব সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য এতোই বেড়েছে যে, সরকারি কর্মকর্তাদের কাছেও এরা চাঁদাদাবি করছে। গত ১লা জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার অনলাইন পোর্টালের সাংবাদিক পরিচয়দানকারী শাহিন মিয়া তাকে কক্সবজার ভ্রমণের জন্য বিমানের ৩টি টিকিট ও পাঁচতারকা হোটেলে ৩ রাত থাকার ব্যবস্থা করার দাবি জানান। তিনি (নির্বাহী কর্মকর্তা) তাতে রাজি না হওয়ায় শাহিন মিয়া ৫০ হাজার টাকা দাবি করে এবং টাকা না দিলে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার হুমকি দেয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব অপসাংবাদিকদের উৎসাহ দিচ্ছেন ভুইফোঁড় পত্রিকা মালিকগণ। তারা পত্রিকার নামে অফিস খুলে কার্ড বাণিজ্য করে চলেছেন। পত্রিকার ডিক্লারেশন টিকিয়ে রাখতে এরা মাঝেমধ্যে কয়েক কপি পত্রিকা ছাপেন। অথচ চাঁদাবাজদের কাছে তারা কার্ড বিক্রি করেন। অনেক সময় এসব চাঁদাবাজরা ভুঁইফোঁড় ওই অফিসের ভাড়া পরিশোধসহ অফিসের বসের খাবার পর্যন্ত সরবরাহ করেন।
এসব ভুঁইফোঁড পত্রিকার কার্ড চলে যায় হকার, ট্রাক ড্রাইভার, সিকিউরিটি গার্ড ব্যবসায়ী, কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ, দারোয়ান, ভাত বিক্রেতা, রাজমিস্ত্রি, পান বিক্রেতার কাছেও। এসব কার্ড চলে যায় তরুণীদের কাছে, যা দিয়ে তারা বøাকমেইলসহ অনৈতিক কাজ করে। কেউ কেউ দিনের বেলায় দালাল আবার রাতে সাংবাদিক।
পুলিশ জানায়, ভুয়া সাংবাদিকদের পুলিশ মাঝেমধ্যেই গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে টেলিভিশন চ্যানেল এবং পত্রিকার জাল পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়। তাদের মোটরবাইকেও লাগানো থাকে টেলিভিশন চ্যানেল ও পত্রিকার স্টিকার এরা এমনভাবে টেলিভিশন চ্যানেলের স্টিকার ক্যামেরায় লাগায় আসল আর নকল বোঝা দায়। পেশাদার সাংবাদিকরাও তাদের দেখে মাঝেমধ্যে বিভ্রান্ত হন। ক্যামেরায় জাল স্টিকার লাগিয়ে মানুষকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায় করে।
পেশাদার সাংবাদিকদের একমাত্র সংগঠন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, সাংবাদিক হতে কোনো একাডেমিক সার্টিফিকেট বা কোনো সনদ লাগে না। যে কারণে এখন ঘরে ঘরে সাংবাদিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যার একটি আইডি আছে সেও নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেয়। ফলে এখন কে সাংবাদিক, আর কে সাংবাদিক না; তা পৃথক করা মুশকিল হয়ে পড়েছে। যে কারণে অপসাংবাদিকতা বেড়েছে। আর পেশাদার সাংবাদিকরা ক্রমেই এই অপসাংবাদিকতার কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। পেশাদারিত্বের জায়গায় আসল সাংবাদিকরা পিছিয়ে পড়ছে। ফলে ক্রমেই দৌরাত্ম্য বাড়ছে ভুয়া সাংবাদিকদের। তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারছে। কারণ রাষ্ট্র বা সমাজের কাছে তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তাদের লজ্জা বা ভয় কোনোটাই নেই। যে কারণে তারা যতদূর পারছে বেপরোয়া আচরণ করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একটিই পথ, যা হচ্ছেÑ কে সাংবাদিক, আর কে সাংবাদিক না; তা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে হবে। পেশাদার সাংবাদিকদের তালিকা করতে হবে। সেই তালিকা অনুযায়ী সনদ দিতে হবে। এর বাইরে কেউ সাংবাদিক পরিচয় দিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছেÑ গণমাধ্যমের লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। লাইসেন্স দেয়ার সময় দেখতে হবে; যিনি লাইসেন্স নিচ্ছেন তার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার আর্থিক এবং নৈতিক সক্ষমতা রয়েছে কি-না। যাকে-তাকে লাইসেন্স দেয়ার ফলে যেটা হচ্ছেÑ মালিক সাংবাদিক নিয়োগ দিয়ে তাদের বেতন না দিয়ে উল্টো তাদের দিয়ে চাঁদাবাজি করাচ্ছেন. যা পেশাটিকে দিন দিন ডুবাচ্ছে। আবার সাংবাদিকরাও দিনের পর দিন বেতন না পেয়ে তারা ধান্ধাবাজিতে লিপ্ত হচ্ছেন। এগুলো কঠোরভাবে দেখা উচিত। কোনো গণমাধ্যম মালিক পরপর ৩ মাস বেতন দিতে না পারলে অবশ্যই তার লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। মালিককে সাংবাদিক কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাধ্য করতে হবে। এগুলো কার্যকর হলেই দেখবেন অপসাংবাদিকতা বা ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য কমে যাবে এবং পেশার মান বাড়বে।