
ড. মো. রফিকুল ইসলাম\ বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবে কৃষিপ্রধান দেশ। আর এ দেশের আবহাওয়া উষ্ণ, আর্দ্র ও মাটি অত্যন্ত উর্বর। আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। তবে এ দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৮.৩৪ শতাংশ মানুষ গ্রামে বা গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে।
তবে প্রতিনিয়ত ফসলি জমি কমে যাচ্ছে। এর কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঘরবাড়ি, শিল্প-কারখানা ইত্যাদি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সঙ্গে নদীভাঙন তো আছেই। আর নদীভাঙনের বড় কারণ হলো অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে শত শত একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
বিশেষ করে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সমাজের এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন। আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে চলছে ইজারাদারদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্য। অর্থাৎ ইজারার শর্ত ভঙ্গ করলে জামানত বাজেয়াপ্ত ও ইজারা বাতিলে স্পষ্ট আইনি বিধান থাকলেও বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বালুমহালকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী ঘটনাগুলো যেন কোনো থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়। জানা যায়, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, যাদুকাটাসহ অনেক নদীর বুকে চলছে শত শত অবৈধ ড্রেজারের তান্ডব।
আর এই ধ্বংসযজ্ঞ চলছে স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায়। মাঝেমধ্যে লোক-দেখানো অভিযান পরিচালনা করা হলেও রাতে দ্বিগুণ উৎসাহে শুরু হয় বালু চুরি। অর্থাৎ স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছত্রচ্ছায়ায় এই বালু বিক্রির মহোৎসব চলছে। এর ফলে নদীভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হচ্ছে শত শত একর ফসলি জমি ও বসতভিটা। এর প্রভাব পড়ছে পরিবেশ-প্রতিবেশের ভারসাম্যের ওপর।
যমুনা সেতু ও রেল সেতু এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন সচল থাকায় দেশের বৃহত্তর স্থাপনা হুমকির মুখে। জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার নিষেধ করা সত্তে¡ও বালু উত্তোলন চলছে। এর ফলে গাইড বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়াসহ হুমকির মুখে পড়ছে যমুনা সেতু ও রেল সেতু। বিশেষত যমুনা সেতুর নিচ দিয়ে বাল্কহেড চলাচল অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল অধ্যাদেশ ১৯৭৬ এবং বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২৩)-এর অধীনে সম্পূর্ণ অবৈধ ও দন্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ও কেপিআই অবকাঠামো হওয়ায় সেতু কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। এই অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তীরবর্তী অনেক পরিবার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আর ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে পানির প্রবাহে গতি পরিবর্তন হয়ে নদীর পার ভেঙে এলাকার ফসলি জমিসহ বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। তবে বালু উত্তোলনকারী প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। এদিকে বালু উত্তোলনকারীরা অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়টি অস্বীকার করছেন।
এ কথা সত্যি যে প্রয়োজনের তাগিদে বালু উত্তোলন করা জরুরি। তবে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী নিরাপদ স্থান থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়ে বলা হয়েছে। অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন করা সম্পূর্ণ বেআইনি। কিন্তু বাস্তবে এর চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। এ ধরনের কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে শ্যালো মেশিন ও বোমা মেশিনের সাহায্যে বালু উত্তোলন করছে একটি প্রভাবশালী মহল। এ বিষয়ে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে বোমা মেশিনের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন উচ্চ আদালত। এ ছাড়া বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর নীতিমালা অনুযায়ী পাম্প বা অন্য কোনো মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাবে না। অর্থাৎ বিপণনের উদ্দেশ্যে কোনো উন্মুক্ত স্থান, চা-বাগানের ছড়া বা নদীর তলদেশ থেকে বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাবে না। এ ছাড়া সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারাজ, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, বন, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা বা আবাসিক এলাকা থেকে বালু ও মাটি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই আইনের (৩) উপধারা (২)-এ উল্লেখ রয়েছে যে ড্রেজিং কার্যক্রমে বাল্কহেড বা প্রচলিত বলগেট ড্রেজার ব্যবহার করা যাবে না। সর্বোপরি এভাবে বালু উত্তোলন আইনগত দন্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচ্য হবে। এ ছাড়া ২০১৯ সালের ১৭ই জুন মহামান্য হাইকোর্ট বলেন, নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে না পারলে জেলা প্রশাসকরা যেন চাকরি ছেড়ে দেন। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী নদীর আইনগত সত্তার ধারণা থেকে কলম্বিয়ার আদালতের একটি রায় থেকে সূচনা হয়েছে। তবে নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশেষ বিশেষ নদীকে লিগ্যাল পারসন (আইনি ব্যক্তি) ঘোষণা করা হয়েছে। তা ছাড়া ২০১৭ সালের মার্চ মাসে ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যের হাইকোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে গঙ্গা ও যমুনা নদীসহ বাস্তুতন্ত্রকে জীবন্ত মানুষের মর্যাদা দিয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন ২০১৯ সালের একটি রায়ে দেশের নদীগুলোকে জুরিস্টিক পারসন (কৃত্রিম আইনগত ব্যক্তি) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি সংগঠনের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তুরাগ নদকে লিভিং এনটিটি (জীবন্ত সত্তা) ঘোষণা করা হলেও পরে দেশের সব নদীর ক্ষেত্রে এই রায় বহাল রাখা হয়েছে। এর ফলে মানুষের যেসব আইনি অধিকার রয়েছে, এসব নদীরও তেমনি আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনসহ অন্যান্য দূষণ থেকে নদীকে বাঁচাতে যুগান্তকারী এই রায় দেয়া হয়েছে। সর্বোপরি বালু উত্তোলনকারীদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে। প্রয়োজনে আইনের ধারা পরিবর্তন করতে হবে। আর ফসলি জমি রক্ষায় যথাযথ আইনি পদক্ষেপ জরুরি। নতুবা তাঁদের রোধ করা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। তাই বর্তমান সরকারকে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
লেখকঃ গ্রন্থাগার বিভাগের প্রধান, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম