কুমিল্লার ১৮টি উপজেল­ায় ২৮১ ইটভাটার ৯০টি অনুমোদনহীন

              মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী\ কুমিল্লার ১৮টি উপজেলায় সরকারি বিধি-বিধানের তোয়াক্কা না করে গড়ে উঠেছে একের পর এক অবৈধ ইটভাটা। জেলা ইট প্রস্তুত মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ২৮১টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৯০টির কোনো কাগজপত্র বা ট্রেড লাইসেন্স নেই। এসব ইটভাটার বড় একটি অংশ কৃষিজমিতে গড়ে ওঠায় একদিকে নষ্ট হচ্ছে আবাদি জমি, অন্যদিকে কাঠসহ বিভিন্ন দূষণকারী জ্বালানি পোড়ানোর কারণে হুমকিতে পড়ছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য।

              জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জেলায় ১৯১টি ইটভাটার অনুমোদন রয়েছে। অন্যদিকে ১৬টি উপজেলায় ৯০টি ইটভাটা অনুমোদনহীন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে সদর দক্ষিণে ৫টি, বরুড়ায় একটি, বুড়িচংয়ে ৪টি, নাঙ্গলকোটে ১৩টি, দাউদকান্দিতে ২টি, তিতাসে একটি, মনোহরগঞ্জে ৩টি, মুরাদনগর ও বাঙ্গরায় ২০টি, দেবীদ্বারে ৭টি, লাকসামে ৬টি, চান্দিনায় ৭টি এবং চৌদ্দগ্রামে ২১টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। এছাড়া, লাকসামে ৮টি, মনোহরগঞ্জে ৬টি, নাঙ্গলকোটে ১৯টি, বরুড়ায় ৯টি এবং সদর দক্ষিণে ১১টি ইটভাটায় সরকারি বিধি-বিধান না মেনে ইট উৎপাদনের অভিযোগ রয়েছে।

              এসব ভাটার বেশির ভাগেই কয়লার পাশাপাশি কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। কোথাও কোথাও পুরোনো টায়ার, রাবার ও প্লাস্টিকসহ পরিবেশদূষণকারী উপাদানও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও ছাইয়ে আশপাশের ফসলি জমি, গাছপালা ও জনবসতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বছরের পর বছর কাঠ পোড়ানোর কারণে বনাঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ গাছ উজাড় হচ্ছে এবং কৃষিজমির উর্বর মাটি কেটে ইট তৈরির কাজে ব্যবহার করায় জমির উৎপাদনক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

              কুমিল্লা সদর ও আশপাশের কোতোয়ালির তালুকদার, মজুমদার, আশরাফ, বাখরাবাদ, আলেখারচর, চাঁপাপুর, গোমতী নদীর বাঁধ ও সংলগ্ন এলাকা, পদুয়ার বাজার, সুয়াগাজী, নিমসার, কংশনগর, লাকসাম, নাঙ্গলকোট, মনোহরগঞ্জ, বরুড়া, চান্দিনাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ২ শতাধিক ইটভাটা সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে নদীর চর ও আশপাশের এলাকা থেকে মাটি সংগ্রহ করে ইট তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।

              এদিকে স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় কিছু ইটভাটা পরিচালিত হওয়ায় আইন প্রয়োগে শিথিলতা দেখা দিচ্ছে। তবে ইটভাটা মালিকদের একাংশ দাবি করেন, আগুন ধরানোর সময় কিছু কাঠ ব্যবহার করা হলেও নিয়মিত ইট পোড়াতে কয়লাই ব্যবহার করা হয় এবং মাটির উৎস সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা থাকে না।

              চিকিৎসকদের মতে, ইটভাটার চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়া দীর্ঘদিন শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে হাঁপানি, শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ, শিশুদের নিউমোনিয়া, ফুসফুসের জটিলতা, গলা, চর্মরোগ ও চোখের সমস্যাসহ নানা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ইটভাটার ওপর দিয়ে বা কাছাকাছি ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন থাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে।

              আইন অনুযায়ী ১৯৯২ সালের ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন ও ইট প্রস্তত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী কৃষিজমিতে বা আবাসিক এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে জ্বালানি কাঠ ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর কারাদন্ড ও অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে।

              পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় দ্রæত অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধ এবং কৃষিজমি সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন কুমিল্লার সচেতন মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *