আগাম আমনে ভালো ফলন, উৎপাদন খরচের চাপে কৃষকের দুশ্চিন্তা

রংপুর অঞ্চলে আগাম জাতের আমন ধানের ভালো ফলনে খুশি কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়া, তুলনামূলক কম রোগবালাই এবং যথাযথ পরিচর্যায় এবার আশানুরূপ উৎপাদন পেয়েছেন তাঁরা। ধান কাটার পর একই জমিতে আলু, ভুট্টা ও শীতকালীন শাকসবজি চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকরা। তবে সার, শ্রমিক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ নিয়ে তাঁদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রংপুর সদর উপজেলার হরিদেবপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে আগাম আমন ধান কাটার ব্যস্ততা দেখা গেছে। রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা ইতোমধ্যে পাকা ধান ঘরে তুলতে শুরু করেছেন।

কৃষকদের মতে, আগাম জাতের আমন চাষের প্রধান সুবিধা হলো কম সময়ে ফসল ঘরে তুলে একই জমিতে পরবর্তী মৌসুমের ফসল আবাদ করা যায়। এতে ধানের ফলন কিছুটা কম হলেও পরবর্তী ফসল থেকে বাড়তি আয় করার সুযোগ তৈরি হয়।

রংপুর সদর উপজেলার হরিদেবপুর গ্রামের কৃষক রহমত আলী জানান, আগাম আমন ধান কাটার পর ওই জমিতে আলু এবং পরে ভুট্টা চাষ করবেন তিনি। তাঁর জমিতে প্রতি বিঘায় ১২ থেকে ১৫ মণ ধান উৎপাদিত হয়েছে। প্রতি মণ ধান ৬২০ টাকা দরে বিক্রি করছেন তিনি।

রহমত আলী বলেন, ধানের দাম মোটামুটি ভালো পাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট। ফসল ঘরে তুলে পরিবারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি পরবর্তী ফসল চাষের পরিকল্পনা করছেন।

তবে কৃষক সবুজ মিয়ার মতে, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ধানের বর্তমান দাম আরও কিছুটা বেশি হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, সার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, আর শ্রমিকদের প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি দিতে হচ্ছে। কৃষকরা উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম পেলে তাঁদের সংসার চালানো সহজ হতো।

রংপুরের মহিপুর তিস্তার চর এলাকার কৃষক শফিয়ার রহমান পাঁচ বিঘা জমিতে আগাম আমন চাষ করেছেন। এর মধ্যে তিন বিঘা জমি থেকে ৪৭ মণ ধান পেয়েছেন। বাকি দুই বিঘার ধান প্রায় এক সপ্তাহ পর কাটার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

শফিয়ার রহমান জানান, আগাম জাতের আমনে সাধারণত প্রতি বিঘায় ১৬ থেকে ১৮ মণ ধান পাওয়া যায়, যা প্রচলিত জাতের তুলনায় কিছুটা কম। এ বছর প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ পড়েছে প্রায় ১৪ হাজার টাকা। গত বছর একই পরিমাণ জমিতে খরচ হয়েছিল ১২ হাজার টাকা।

ধান কাটার পর জমিতে আগাম ফুলকপি, গাজর, বেগুন ও ধনিয়াপাতা চাষ করবেন তিনি। এসব সবজি তোলার পর একই জমিতে বোরো ধান আবাদের পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট গ্রামের কৃষক আদিলুর রহমান ছয় বিঘা জমিতে আগাম আমন চাষ করেছেন। তাঁর হিসাবে, এবার এই জমিতে ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৮৭ হাজার টাকা, যেখানে গত বছর খরচ হয়েছিল ৭১ হাজার টাকা।

আদিলুর রহমান বলেন, আগাম আমনের ফলন কিছুটা কম হলেও দ্রুত ধান কাটার পর শীতকালীন শাকসবজি চাষ করা যায়। এতে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। এবার ফলন ভালো হলেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

কালীগঞ্জের কাকিনা চর রুদ্রেশ্বর এলাকার কৃষক হোসেন আলী জানান, তাঁদের এলাকায় চলতি সপ্তাহ থেকে আগাম আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। এ বছর রোগবালাই কম থাকায় আশানুরূপ ফলন পাওয়া গেছে। তিনি তিন বিঘা জমি থেকে ৫২ মণ ধান পেয়েছেন। ধান কাটার পর জমিতে আগাম ফুলকপির আবাদ শুরু করেছেন।

অন্যদিকে হাতীবান্ধার চর গড্ডিমারা এলাকার কৃষক রওশন আলম বলেন, এ বছর এলাকায় বন্যা না হওয়ায় আগাম আমনের তেমন ক্ষতি হয়নি। ধান কাটার পর দ্রুত শীতকালীন ফসল আবাদ করার লক্ষ্যেই তাঁরা আগাম জাতের ধান চাষ করেন। তাঁর চার বিঘা জমির ধান পেকে গেছে; দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে কাটার কাজ শুরু করবেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রংপুর জেলায় এক লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে রংপুর সদর উপজেলায় ২০৫ হেক্টর, কাউনিয়ায় ২২৫ হেক্টর, মিঠাপুকুরে দুই হেক্টর এবং মহানগর এলাকায় তিন হেক্টরসহ মোট ৪৩৫ হেক্টর জমির আগাম আমন ধান কাটা হয়েছে। এসব জমিতে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন হয়েছে ৩ দশমিক ১৫ টন।

রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা—কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে এ বছর মোট ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। এসব জমি থেকে ২০ লাখ ১ হাজার ৩৯১ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের আমন ধানের আবাদ হয়েছে ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আবু বকর সাইফুল ইসলাম জানান, উঁচু জমিতে চাষ করা আগাম জাতের আমন ধান ইতোমধ্যে কাটা শুরু হয়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ জাতের ধান কাটার কার্যক্রম চলে। নভেম্বরের শুরুতে মৌসুমের অন্যান্য আমন ধান কাটা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

তিনি বলেন, এ বছর বন্যার প্রভাব তুলনামূলক কম থাকায় আগাম আমনের উৎপাদন আশানুরূপ হয়েছে। ধান কাটার পর কৃষকরা একই জমিতে ভুট্টা, আগাম আলু ও বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন শাকসবজি চাষ করতে পারবেন।

কৃষি কর্মকর্তাদের আশা, আমনের ভালো ফলনের পাশাপাশি পরবর্তী মৌসুমের রবিশস্য থেকেও কৃষকরা বাড়তি আয় করতে পারবেন। তবে উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি মোকাবিলা করে কৃষকের প্রকৃত লাভ নিশ্চিত করতে ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিরোনামটি আরও তীক্ষ্ণ করুনপ্রতিবেদনটি আরও সংক্ষিপ্ত করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *