
বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ১২ কেজি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার। এই পরিস্থিতিতে আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে সিলিন্ডারপ্রতি দাম আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি নভেম্বরের নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের কারণে গ্যাসের দাম বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) এলপিজির দাম পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি করেছে বিইআরসি। শুনানিতে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পর্যায়ে কমিশন বাড়ানোর দাবি জানান। তাঁদের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে কমিশনের কারিগরি কমিটি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১৩৯ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। বর্তমানে এ সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।
তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে নতুন করে দাম বাড়ানোর উদ্যোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা। তাঁদের আশঙ্কা, কমিশন বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে দাম সমন্বয় করা হলে সাধারণ মানুষের রান্নার খরচ আরও বেড়ে যাবে।
কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব
বর্তমানে প্রতি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মজুত ও বোতলজাতকরণ বাবদ কোম্পানিগুলো ২০০ টাকা কমিশন পায়। এই কমিশন বাড়িয়ে ৪৭৮ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে ওমেরা। পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেলটা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে।
এ ছাড়া পরিবেশকেরা প্রতি সিলিন্ডারে কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। অটোগ্যাসের ক্ষেত্রে প্রতি লিটারে কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার প্রস্তাব এসেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, গত কয়েক বছরে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। সে অনুযায়ী কমিশন পুনর্নির্ধারণ না করায় তাঁদের ব্যবসা পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। যৌক্তিকভাবে দাম নির্ধারণ করা হলে বাজারে নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির প্রবণতা কমবে বলেও তাঁদের কেউ কেউ মনে করছেন।
তবে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে ভোক্তাদের বাড়তি ব্যয়ের চাপ কতটা বাড়বে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নভেম্বরেও বাড়তে পারে দাম
এলপিজির দাম বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি। বিইআরসি ও আমদানিকারক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম এবং জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ায় নভেম্বরের নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১০০ টাকার বেশি বাড়তে পারে।
এর সঙ্গে কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাব কার্যকর হলে সিলিন্ডারপ্রতি মোট মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। ফলে রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশে এলপিজি ব্যবসার প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। রান্নার কাজে এই জ্বালানির ব্যবহার প্রায় ৮০ শতাংশ এবং এক কোটির বেশি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন।
সরবরাহ সংকট ও বাজারে অস্থিরতা
টানা দেড় মাস ধরে এলপিজির বাজারে অস্থিরতা চলছে। অক্টোবরের শুরুতে দাম বাড়ানোর পরও বাজারে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
দেশে এলপিজি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ৩৫টি কোম্পানির মধ্যে ২৩টির আমদানির অবকাঠামো থাকলেও গত মাসে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি কোম্পানি। ঋণপত্র খুলতে জটিলতা এবং আমদানি কার্যক্রমে সমস্যার কারণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো অব্যবহৃত পড়ে থাকার কথাও শুনানিতে উঠে এসেছে।
ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, আমদানি ও সরবরাহে সমস্যা থাকায় বাজারে সিলিন্ডারের সংকট তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে পরিবেশকদের অভিযোগ, সংকট দেখা দিলে কোম্পানিগুলো সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এতে তাঁদের অতিরিক্ত খরচ হয় এবং নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ভোক্তাদের আপত্তি, কঠোর নজরদারির দাবি
গণশুনানিতে এলপিজির নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে না পারা এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিনিধিরা দাম না বাড়িয়ে প্রথমে সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি চলতে থাকলে কমিশন বাড়ানোর উদ্যোগ ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে না।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রতিনিধি সৈয়দ মিজানুর রহমানও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রতিবাদে সমিতির পক্ষ থেকে শুনানি বর্জনের কথা জানান তিনি।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের মতে, বাজারে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি বন্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে দ্রুত দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে ভোক্তাদের ন্যায্য জ্বালানি পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে না।
সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ভোক্তারা
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, গণশুনানিতে অংশ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের মতামত বিশ্লেষণ করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কমিশন ও অন্যান্য ব্যয়ের হিসাব ২০২১ সালে নির্ধারণ করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে ব্যয় পরিবর্তিত হওয়ায় সেগুলো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে।
তবে শুনানির পর মতামত জমা দেওয়ার জন্য আগামী রোববার পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করায় প্রক্রিয়াটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো। তাদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
এখন পর্যন্ত কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাব চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পরিণত হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, আমদানি ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং ব্যবসায়ীদের কমিশন বাড়ানোর দাবি—সব মিলিয়ে নভেম্বর মাসে এলপিজির দাম নিয়ে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই মূল্যবৃদ্ধির বোঝা কতটা ভোক্তাদের ওপর পড়বে, তা নির্ভর করছে বিইআরসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং বাজারে নির্ধারিত দাম কার্যকর করার পদক্ষেপের ওপর।