
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং চলমান অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় কমানোর লক্ষ্য নিয়ে চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এ সফরে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে।
সফরসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ১২টি অগ্রাধিকার খাতে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্যাকেজের প্রস্তাব সামনে রাখা হয়েছে। পরিবহন, শিল্পায়ন, জ্বালানি, বন্দর, প্রযুক্তি ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে এই বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত অর্থের সম্পূর্ণ অংশ বিনিয়োগ হিসেবে চূড়ান্ত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে আগামীকাল মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পাবে।
আলোচনায় মেট্রোরেল ও ঋণের সুদ
বাংলাদেশের চলমান অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মধ্যে ঢাকার মেট্রোরেল নিয়ে আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় কমানো, জাপান থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার হ্রাস এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলোচনা হতে পারে।
এ ছাড়া জাপানের সঙ্গে প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ ও আর্থিক সহায়তাসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রস্তাবিত সহায়তার আওতায় বাজেট সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো খাত অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তার জন্য বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
শিল্প ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা
প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্যাকেজের বড় অংশ পরিবহন ও নগর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ খাতে ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব রয়েছে। মাতারবাড়িকেন্দ্রিক শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোর উন্নয়নে রাখা হয়েছে ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া উৎপাদন শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর ও অটোমোবাইল খাতে ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার এবং জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব রূপান্তরে ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব রয়েছে। জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নে আরও ৯৪০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
কৃষি, ওষুধশিল্প, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, সামুদ্রিক অর্থনীতি, পর্যটন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ অন্যান্য খাতের জন্য প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে অর্থায়নের শর্ত, প্রকল্প নির্বাচন ও কার্যকর চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বাস্তবায়নে জোর
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ কার্যকর করার বিষয়টিও সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য। এর মাধ্যমে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ প্রশিক্ষণেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন খাতে পাঁচ থেকে আটটি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তির সংখ্যা ও বিষয়বস্তু সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে জাপানের বিভিন্ন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠক রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো), ইউনিক্লো, মিত্সুই, সুমিতোমো এবং জেরা।
এসব বৈঠকে বাংলাদেশে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বুধবার টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামেও বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরিতে এই ফোরাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী জাপানের চিবা অঞ্চলে জেরার এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। এ ছাড়া নিটসু লজিস্টিকস হাব এবং নাগোয়ায় টয়োটা মোটর করপোরেশনের কারখানা পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতার বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়গুলো আলোচনায় স্থান পাবে বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা।
সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার জাপানের নাগোয়া থেকে টোকিও ফিরে নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। ওই দিন রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে তাঁর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। মেট্রোরেলসহ দেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এবারের সফরে বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন এবং বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে দুই দেশের অগ্রগতি কতটা হয়, সেদিকেই নজর থাকবে।