
অন্তর্বর্তী সরকারের ‘ক্ষমতা সীমিত’ এবং রাজনৈতিক ‘ম্যান্ডেটের’ অভাব থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে ছিল। ফলে নতুন সংস্কারের চেয়ে ভেঙে পড়া ব্যবস্থাকে সামাল দেওয়াই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ।
শুক্রবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর ৫৮তম সমাবর্তনে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন তিনি।
সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমি দুটি শব্দ ব্যবহার করি—রিপেয়ার ও রিফর্ম। প্রথমে আমাদের রিপেয়ার করতে হয়েছে, পরে রিফর্ম।” তিনি জানান, ব্যাংক খাত, পুঁজিবাজার, রাজস্ব প্রশাসনসহ অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই তখন অস্থিরতা ছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গিয়েছিল এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যও নেতিবাচক অবস্থায় ছিল।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক ম্যান্ডেট না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। “আমাদের স্ট্রেন্থ ছিল না, ম্যান্ডেটও ছিল না,”—বলেন তিনি।
ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল আইনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “খারাপ আইন রেখে ভালো ফল আশা করা যায় না।” একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার কাজও কঠিন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কারণে এখন আগের তুলনায় দ্রুত অর্থ উদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে জানান।
দেশে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতেই সুশাসনের অভাব রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, জবাবদিহির সংস্কৃতি দুর্বল হওয়ায় অপচয় ও অদক্ষতা বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, দুই বছরের প্রকল্প ১০–১২ বছর ধরে চলে, আবার পাঁচ বছরের প্রকল্প শেষ হতে ২০ বছরও লেগে যায়।
জ্বালানি খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাবেক এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব দেয়নি, যেখানে প্রতিবেশী দেশগুলো এ ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে। পাশাপাশি শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
রপ্তানি খাতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন প্রণোদনা দেওয়ার পরও অনেক শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে উঠতে পারেনি। বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা এখনও অনেক উল্লেখ করে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সুশাসন, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে। দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একই অবস্থা থেকে শুরু করেও দেশ দুটি আজ অনেক এগিয়েছে।
সমাবর্তনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “সৎ উদ্দেশ্য থাকলে পরিবর্তন অনিবার্য।” তিনি নতুন প্রজন্মকে দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সমাবর্তনে বিবিএ, এমবিএ, ইএমবিএ ও ডিবিএ প্রোগ্রামের মোট ৩৬৫ শিক্ষার্থী অংশ নেন। এ সময় ২৬ জন শিক্ষার্থী ‘ডিরেক্টরস অনার লিস্টে’ স্থান পান এবং দুজন শিক্ষার্থী স্বর্ণপদক অর্জন করেন।