তেলের সরবরাহ বাড়লেও ফিলিং স্টেশনে কমেনি ভিড় 

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে ধারাবাহিকভাবে তেলবাহী জাহাজ আসছে দেশে। এপ্রিলের প্রথম ২০ দিনে ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস তেল নিয়ে মোট ১২টি জাহাজ এসেছে। এতে মজুত কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় এখনো কমেনি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, এ মাসে ৮টি জাহাজে ২ লাখ ৭৪ হাজার টন ডিজেল, ২টি জাহাজে ৫৩ হাজার টন অকটেন, একটি করে জাহাজে প্রায় ১২ হাজার টন জেট ফুয়েল এবং ২৫ হাজার টন ফার্নেস তেল এসেছে। এছাড়া ভারত থেকে পাইপলাইনে আরও ১২ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ হয়েছে। এই সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে গতকাল রোববার থেকে অনেক ফিলিং স্টেশনে জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। বিপিসির কর্মকর্তারা মনে করছেন, কয়েক দিনের মধ্যে চাপ কিছুটা কমতে পারে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, নিয়মিত তেল আসছে এবং এপ্রিল মাসে সংকট নেই। অকটেনের মজুত ইতিমধ্যে মাসিক চাহিদার চেয়েও বেশি হয়েছে। এখন মে ও জুনের সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগাম পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

কোন তেলের মজুত কত

দেশে জ্বালানি ব্যবহারের বড় অংশই ডিজেলনির্ভর—মোট ব্যবহারের প্রায় ৬৩ শতাংশ। চলতি মাসে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত মজুত ছিল ১ লাখ ২ হাজার ১৯১ টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিন চলবে। তবে আরও প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার টন ডিজেল খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব চালান যুক্ত হলে মজুত আরও বাড়বে।

১ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ডিজেল বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৯০৪ টন। দৈনিক গড় বিক্রি ১১ হাজার ১৬১ টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা কম। অর্থাৎ সরবরাহের চাপ থাকলেও চাহিদা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।

অকটেনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। মাসিক চাহিদা প্রায় ৪৭ হাজার টন হলেও ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত মজুত দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ হাজার টনে, যা দিয়ে ২৪ দিন চলবে। এর মধ্যে নতুন একটি জাহাজে ২৭ হাজার টন অকটেন এসে খালাস শুরু হয়েছে, ফলে মজুত আরও বাড়ছে। দৈনিক গড় বিক্রি ১ হাজার ১১৫ টন, যা গত বছরের তুলনায় কম।

পেট্রলের মজুত রয়েছে ১৯ হাজার ১২৬ টন, যা দিয়ে প্রায় ১৪ দিন চলবে। দৈনিক গড় বিক্রি ১ হাজার ২৫৩ টন—গত বছরের তুলনায় কম। অর্থাৎ ছোট যানবাহনের জ্বালানির চাহিদাও কিছুটা কমেছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফার্নেস তেলের মজুত রয়েছে ৬৭ হাজার ৩৭৮ টন, যা দিয়ে প্রায় ৩০ দিন চলবে। এ মাসে দৈনিক গড় বিক্রি ১ হাজার ৭২০ টন, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। গ্যাস সংকট না বাড়লে এই খাতে চাপ কমই থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে জেট ফুয়েলের চাহিদা বেড়েছে। বর্তমানে মজুত রয়েছে ২৩ হাজার ৮৬ টন, যা দিয়ে প্রায় ১৫ দিন চলবে। দৈনিক গড় বিক্রি ১ হাজার ৭৭৫ টন, যা গত বছরের তুলনায় বেশি—বিমান চলাচল বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কেরোসিন ও মেরিন ফুয়েলের মজুত যথাক্রমে প্রায় ৩৬ ও ৩২ দিনের। এই দুই জ্বালানির চাহিদা কম হওয়ায় সরবরাহেও চাপ কম।

সরবরাহ বাড়ছে, তবু দীর্ঘ অপেক্ষা

জ্বালানি তেলের মজুত দ্রুত বাড়ছে এবং এ সপ্তাহে আরও অন্তত ৫টি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। এতে বিশেষ করে অকটেন ও ফার্নেস তেলের ক্ষেত্রে স্বস্তি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ডিজেলের বড় চালান খালাস হলে পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হতে পারে।

তবে এই স্বস্তির প্রভাব এখনো মাঠপর্যায়ে পুরোপুরি পড়েনি। চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে এখনো দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে মানুষকে। কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর তেল পাচ্ছেন, আবার কেউ খালি হাতেই ফিরছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের ঘাটতির কারণে তৈরি হওয়া চাপ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। নতুন সরবরাহ সব পর্যায়ে পৌঁছাতে সময় লাগছে। তাই ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় কমতে এখনো কিছুটা সময় লাগবে।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, “এ মাসে তেলের কোনো সংকট নেই। পর্যাপ্ত আমদানি হয়েছে, আরও জাহাজ আসছে।”

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *