
বেগম রোকেয়ার জন্মের ৭ বছর পূর্বেই এ দেশে নারী শিক্ষার প্রসারে প্রথম ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী। কিন্তু ঐতিহাসিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তিনি এখনো উপেক্ষিত বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তৎকালীন কলকাতা-কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী ও গবেষকেরা এই মহীয়সী নারীর ইতিবাচক অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন না করায় তিনি পর্দার অন্তরালে রয়ে গেছেন। পরবর্তীতে মিডিয়ার জোর প্রচারণায় নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে বেগম রোকেয়া ইতিহাসের পাতায় শক্ত স্থান করে নিলেও, নারী শিক্ষার প্রকৃত অগ্রদূত হিসেবে নবাব ফয়জুন্নেছার রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক স্বীকৃতির বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮৩৪ সালে কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলার পশ্চিমগাঁয়ে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বের একমাত্র মুসলিম মহিলা নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী। ১৮৫০ সালে কলকাতায় যখন ‘বেথুন স্কুল’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তখন সেখানে মুসলিম ও নারীদের ভর্তির ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ ছিল। এই ঘটনা কিশোরী ফয়জুন্নেছাকে দারুণভাবে পীড়িত করে এবং তিনি নিজের অঞ্চলে নারী শিক্ষা বিস্তারের সংকল্প করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৭৩ সালে তিনি কুমিল্লা শহরের বাদুরতলায় একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল (যা বর্তমানে নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় নামে পরিচিত) এবং নানুয়ার দিঘির পাড়ে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
শিক্ষানুরাগের পাশাপাশি সাহিত্য অঙ্গনেও তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। অত্যন্ত রক্ষণশীল ও ধর্মভীরু পরিবেশে বড় হলেও তিনি চারটি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। ১৮৭৪ সালে তিনি ‘সুর লহরী’ ও ‘সংগীত সার’ নামক দুটি বই বুলেটিন আকারে প্রকাশ করেন। এরপর ১৮৭৬ সালে তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘রুপ জালাল’ প্রকাশের মাধ্যমে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপক সাড়া জাগান এবং প্রথম মুসলিম মহিলা কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেন। উল্লেখ্য, এই ‘রূপ জালাল’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশেরও ৪ বছর পর, অর্থাৎ ১৮৮০ সালে বেগম রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৬ বছর বয়সে (১৮৫০ সালে) জমিদার গাজী চৌধুরীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন নবাব ফয়জুন্নেছা। তবে ১১ বছরের দাম্পত্য জীবনের একপর্যায়ে মান-অভিমান, প্রতারণা ও শর্ত ভঙ্গের কারণে স্বামীর সাথে তার দূরত্ব সৃষ্টি হয় এবং তারা আলাদা থাকতে শুরু করেন। তবে সমস্ত পারিবারিক প্রতিকূলতা ও পিতৃহীনতার কষ্ট ডিঙিয়ে তিনি আজীবন নারী শিক্ষার আলো ছড়াতে কাজ করে গেছেন।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বাংলার নারী জাগরণ ও শিক্ষার ইতিহাসে বেগম রোকেয়ার অবদান যেমন অনস্বীকার্য, ঠিক তেমনি তার বহু আগে প্রতিকূল সময়ে নারী শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীকেও ইতিহাসের পাতায় তার প্রাপ্য মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।