

মইনুল ইসলাম\ ব্যবহার নেই বললেই চলে; তবু গুনতে হচ্ছে মাসিক বিল! অথচ- একসময় বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে, বিশেষ করে অফিস-আদালত, শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বানিজ্য প্রতিষ্ঠান, আর ভালো অবস্থা সম্পন্ন স্বচ্ছল মানুষজনের সহজ এবং দ্রæত যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিলো টিএন্ডটি বা ল্যান্ডফোন। পরবর্তীতে টিএন্ডটি’র বদলে রূপান্তরিত হয়েছে বিটিসিএল-এ। অথচ, এখন মুঠোফোন ও ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রবর্তনে সেই জায়গা দখল করে থাকলেও লাকসামের অনেক প্রতিষ্ঠানে পুরোনো ল্যান্ডফোনের সংযোগ এখনো চালু রয়েছে। কিন্তু এগুলোতে সেবা বলতে তেমন কিছুই নেই; নেই তাদের কোনো কার্যক্রমও!
মূলতঃ এসব ফোন ব্যবহার প্রায় নি:শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু পুরনো সেই সংযোগ আজও চালু থাকায় গ্রাহকদের নিয়মিত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছেই।
এমনই একটি উদাহরণ হলো- কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলা থেকে নিয়মিত প্রকাশিত সরকারি মিডিয়াভুক্ত সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা পত্রিকা কার্যালয়ের বিটিসিএল-এর মৃতপ্রায় ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও। পত্রিকা অফিসে প্রায় ৪ দশক যাবত চালু থাকা সেই ফোনটি বর্তমানে অফিসের দৈনন্দিন কাজে তেমন ব্যবহার করা না হলেও কিন্তু বিল পরিশোধ করা হচ্ছে নিয়মিতভাবেই।
এমনিভাবে প্রতি মাসে নিয়মিত বিল আসছে এবং তদানুযায়ী পরিশোধ করতে হচ্ছে সকল মাসিক বিলের টাকাও। এমন তথ্য জানিয়েছেন- পত্রিকাটির প্রকাশক ও সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া নিজেই।
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, বর্তমানে মুঠোফোন ও ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগের ওপরই অফিসের কার্যক্রম চলে থাকে অনেকাংশেই। ফলে টিএন্ডটি বা বিটিসিএল-এর মৃতপ্রায় ফোনটির ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। এরপরও সংযোগ চালু থাকায় নিয়মিত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছেই। আর শুধু বিল পরিশোধই নয়; মাঝেমধ্যে সংযোগে ত্রুটি বা বিচ্ছিন্নতা দেখা দিলে সেটি সচল করতে বিটিসিএলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এতে সময় ও শ্রম ব্যয় হয়। কিন্তু আসলে যথাসময়ে যথাযথভাবে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া দুষ্করই বটে।
লাকসামবার্তা পত্রিকা সম্পাদক বলেন, বাস্তবে ব্যবহার না থাকলেও ফোনটি অফিসের পুরোনো যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই পড়ে আছে মাত্র। ফলে একদিকে নিয়মিত বিলের দায়, অন্যদিকে সংযোগে সমস্যা হলে তা ঠিক করার বাড়তি ভোগান্তি দুই দিকই সামলাতে এবং হিমশিম খেতে হচ্ছে।
মূলতঃ একসময় একটি টিএন্ডটি ফোনের সংযোগ পাওয়া ছিল অনেকটা কাঙ্খিত বিষয়। সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, ব্যবসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অনেক বাসাবাড়িতেও ল্যান্ডফোনের সংযোগ ছিলো। তৎকালীন সময়ে এটি ছিলো জরুরি যোগাযোগের প্রধান মাধ্যমই বটে। দেশ-বিদেশে অবস্থানরত দূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলা থেকে শুরু করে অফিসের জরুরি যোগাযোগ- সবকিছুর জন্যেই নির্ভর করতে হতো অনেকটা এই তারযুক্ত ফোনের ওপরই।
তবে প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সেই চিত্রও বদলে গেছে। মুঠোফোনের ব্যাপক বিস্তার এবং ইন্টারনেটনির্ভর যোগাযোগের কারণে এখন মুহূর্তেই দেশের যেকোনো প্রান্তে কথা বলা, বার্তা পাঠানো কিংবা ভিডিও কল করা সম্ভব। ফলে একসময়কার অপরিহার্য সেই ল্যান্ডফোন এখন অনেক প্রতিষ্ঠানেই এক রকম অপ্রয়োজনীয়ই হয়ে পড়েছে।
তদপুরি লাকসামের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়েও এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে। কোথাও ল্যান্ডফোনের ব্যবহার কমেছে, আবার কোথাও সংযোগ থাকলেও ফোনটি দীর্ঘদিন ধরে প্রায় অব্যবহৃত এবং অকেজো। তবে সংযোগ চালু থাকলে বিলের বিষয়টি থেকেই যাচ্ছে।
আসলে বিটিসিএল এখনো ল্যান্ডফোন সেবা চালু রেখেছেন। প্রতিষ্ঠানটির নিয়ম অনুযায়ী, লিখিত নোটিশের মাধ্যমে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্নের ক্ষেত্রেও গ্রাহকের দেনা-পাওনা নিষ্পত্তির বিষয়টিও জড়িত রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ব্যবহার না করা সংযোগের ক্ষেত্রে গ্রাহকের জন্য সংযোগ বন্ধের সুযোগ থাকলেও সেটি যথাযথ প্রক্রিয়াতেই করতে হয়। কিন্ত বিটিসিএলের টেলিফোন সেবা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, সংযোগ-সংক্রান্ত বিষয়ে গ্রাহকরা সংশ্লিষ্ট বিটিসিএল কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে পারেন। তথ্য ও সেবার জন্য ১৬৪০২ নম্বরেও যোগাযোগের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময়ে বিটিসিএল-এর অফিসে ১টা মাছি মারার কেরানিও উপস্থিত থাকছেন না। কোটি কোটি টাকা মূল্যের ভবন ও আশপাশের এরিয়া থাকছে তালাবদ্ধ এবং অরক্ষিতই বটে!
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে যে, লাকসাম বাইপাস সংলগ্ন চৌদ্দগ্রাম রোডের উত্তর পাশে অবস্থিত বিটিসিএল -এর বিল্ডিং সম্মূখের সাইনবোর্ডে “সংরক্ষিত এলাকা বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ” লেখা থাকলেও সেখানে এবং বিল্ডিং আঙ্গিনায় বিভিন্ন বখাটেদের আড্ডাখানারূপে পরিগণিত হয়েছে। সংরক্ষিত এলাকার সাইনবোর্ড অতিক্রম করেও সকাল-সন্ধ্যায় সেখানে বিল্ডিং গেটের ভিতরে অনেক স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে। দিনে রাতে ষ্টাফ আনু মিয়া নামক লাইনম্যান ছাড়া গোটা ভবন এরিয়ায় আর কাউকে উপস্থিত পাওয়া যায়নি।
অতপর, এখানে বাস্তব প্রশ্ন হচ্ছে- যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরের পর বছর ল্যান্ডফোনের ব্যবহার নেই, সেসব সংযোগ কতটা প্রয়োজনীয় এবং কতগুলো সংযোগ এখনো কার্যকর অবস্থায় রাখা হচ্ছে। ব্যবহার না করা সংযোগের কারণে গ্রাহকের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হচ্ছে কিনা- সেটিও পর্যালোচনা করার জোর দাবি রাখে।
অবশ্য। ল্যান্ডফোনকে পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় বলারও সুযোগ নেই বটে! কারণ মফস্বলের পুলিশ ষ্টেশন, উপজেলা পরিষদের ইউএনও এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন জরুরি সেবায় স্থায়ী অফিসিয়াল যোগাযোগ রক্ষার প্রয়োজনও রয়েছে বটে! সেহেতু, যেখানে প্রয়োজন রয়েছে সেখানে সেবার মান বাড়ানো এবং যেখানে দীর্ঘদিন ব্যবহার নেই, সেখানে সংযোগ বাতিল বা সাময়িক বিচ্ছিন্নের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও গ্রাহকবান্ধব করার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়াই অনস্বীকার্যই।
বলা বাহুল্য, একসময় অফিসের টেবিলে টিএন্ডটি ফোন বাজলে তা ধরতে ছুটে যেতেন কর্মীরা। এখন সেই ফোন অনেক জায়গায় নীরব পড়ে থাকে। বেশিরভাগ স্থানেই এগুলো ডেথ্ অবস্থায় পড়ে আছে। কিন্তু তার সংযোগের বিল আসে নিয়মিতই।
তদানুযায়ী লাকসামের বহুল প্রচারিত সরকারি ডিএফপিভুক্ত লাকসামবার্তা পত্রিকা কার্যালয়ের এই চিত্র- শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি বদলে যাওয়া যোগাযোগ ব্যবস্থার একটা প্রতিচ্ছবি-ই মাত্র।
বস্তুত, আজকালকার মুঠোফোন ও ইন্টারনেটের যুগে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে, এখন টিএন্ডটি বা বিটিসিএল-এর ফোন থাকবে কিনা- তা নয়; বরং বিকল যে সব সংযোগের প্রয়োজন নেই, সেটি কতটা কার্যকরভাবে তদারকি বা ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে এবং গ্রাহক কেন তার জন্য অপ্রয়োজনীয় খরচ করবেন- সেটিই বড় প্রশ্ন হিসেবে থেকে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে শুধু লাকসামবার্তা পত্রিকা কর্তৃপক্ষ নয়; এহেনভোক্তভুগী অনেক গ্রাহকগণও সরকারের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।