মহাসড়কের পাশে হাট-বাজার; চরম ভোগান্তির শিকার যানবাহনের যাত্রীরা

            মুন্সী কামাল আতাতুর্ক মিসেল\ দেশের প্রধান বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক যেন এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। সড়কের বড় একটি অংশ দখল করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা হাট-বাজারের কারণে যানজট, ভোগান্তি আর দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ভ্রাম্যমাণ দোকান, যত্রতত্র পার্কিং এবং হাট-বাজার কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থপনার কারণে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

            রোড সেফটি ফাউন্ডেশন-এর হিসাবে ২০২৫ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৩৫৯ জন। যদিও সড়কে বিশৃঙ্খলা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্ঘটনা রোধে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।

            বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে মহাসড়গুলো কার্যত মহাসড়ক হয়ে উঠতে পারছে না। বিশেষ করে বিভিন্ন স্থানে মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা হাটবাজার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থায়ী, অস্থায়ী এবং অবৈধ হাটবাজার গড়ে উঠেছে- যা মহাসড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব হাটবাজার ঘিরে পণ্য পরিবহণ, ব্যাটারি রিকশা, ইজিবাইক, সিএনজি অটোরিকশা চলাচল, বাস-ট্রাকস্ট্যান্ড ও মানুষের চলাফেরা কমাচ্ছে গাড়ির গতি।

            যত্রতত্র মানুষের রাস্তা পারাপারে ঘটছে দুর্ঘটনা, নিহত ও আহত হচ্ছে মানুষ। শুধু তাই নয়; অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাজারের ইজারা দিয়ে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে কোনো কোনো ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ। বিভিন্ন সময়ে মহাসড়ক সংলগ্ন দোকানপাট উচ্ছেদ করা হলেও কিছুদিন পরই বিভিন্ন পক্ষের সমঝোতায় তা আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। মহাসড়কের পাশে হাটবাজার বসলেই সেটিকে ঘিরে মানুষের সমাগম হয়। বেচাকেনা বাড়ার কারণে স্থানীয়রা মহাসড়কের পাশের অবৈধ জায়গাকেই ব্যবসার উপযুক্ত স্থান হিসাবে বেছে নেয়।

            এতে স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক নেতাসহ প্রশাসনেরও ইন্ধন থাকে। দোকানগুলো থেকে তোলা হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা। অথচ এই হাট-বাজারগুলোর কারণেই প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। হাট-বাজারের কারণে জনসমাগমের চাপ পড়ে মহাসড়কের উপরে। এতে করে একদিকে যানজটের সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে যানবাহনের গতিও কমে যায়। ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে ১ ঘণ্টা বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি সময় লাগে। এতে একদিকে যেমন আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে হচ্ছে সময়ের অপচয়।

            ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে কী পরিমাণ হাট-বাজার ও অবৈধ স্থাপনা রয়েছে তার সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও সরেজমিনে প্রাপ্ততথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, মহাসড়কের কাঁচপুর-দাউদকান্দি অংশে হাট-বাজার ও অবৈধ স্থাপনা রয়েছে ৬টি স্থানে। এছাড়া, দাউদকান্দি-চট্টগ্রাম অংশে হাট-বাজার, স্থায়ী বা অস্থায়ী অবকাঠামো রয়েছে ৫৩টি স্থানে। এসব হাট-বাজারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কুমিল্লার শহীদনগর, গৌরীপুর, ইলিয়টগঞ্জ, কুটুম্বপুর, মাধাইয়া, চান্দিনা, ক্যান্টনমেন্ট, পদুয়ার বাজার, চৌদ্দগ্রাম, মিয়া বাজার বাজার ফেনীর মোহাম্মদ আলী বাজার, মিরসরাইয়ের বারইয়াহাট, সীতাকুন্ডের বড়দারোগারহাট, ছোটদারোগারহাট, ফকিরহাট, শুকলালহাট, বাড়বকুন্ড, বাঁশবাড়িয়া, কৌট্টাবাজার, কুমিরা, বগুলাবাজার, মদনহাট, মাদামবিবিরহাট, ভাটিয়ারী, বানুরবাজার, জলিল গেট বাজার, ফৌজদারহাট, পাক্কা রাস্তার মাথাসহ বিভিন্ন স্থানে মহাসড়কের পাশে এসব হাট-বাজারগুলোতে গেলে দেখা মেলে মহাসড়ক ঘেঁষে বসেছে দোকান পাট। আবার কোথাও কোথাও সড়কের দু’পাশ দখলে নিয়েছে দোকান-পাট ও অস্থায়ী বাজার।

            মহাসড়কের ওপর কুমিল্লার নিমসার বাজার বিকেল ৩টা থেকে জমতে শুরু হয়ে পরদিন দুপুর পর্যন্ত চলে। সড়কের দু’পাশ থেকে বেচাকেনায় ভিড় উপচেপড়ে মহাসড়কেও। দ্রæতগতির মহাসড়কে কমতে থাকে যানবাহনের গতি। এতে ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল। যার কারণে প্রায়ই নিমসার বাজারে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ যানজটের।

            এই মহাসড়কের চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড অংশের ৪২ কিলোমিটারে সড়কে গড়ে উঠেছে ১৭টি বাজার ও হাট। মহাসড়ক ঘেঁষে এসব হাট-বাজারের কারণে প্রতিদিনই সৃষ্টি হচ্ছে যানজট, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন যানবাহনের যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। উপজেলা প্রশাসন এসব বাজার ইজারা দিয়ে রাজস্ব আয় করলেও বাজারকেন্দ্রিক যানজট ও জনদুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে।

            স্থানীয়দের মতে, অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি জননিরাপত্তা ও নির্বিঘেœ যোগাযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই মহাসড়কসংলগ্ন বাজারগুলোকে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে যানজট ও দুর্ঘটনা ঝুঁকি কমানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। মহাসড়কের পাশে বাজার থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা সহজে সবজি সংগ্রহ করতে পারেন। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়েই লাভবান হন। তবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, তারা মহাসড়কের পাশে হাট-বাজার উচ্ছেদে প্রায়ই অভিযান চালিয়ে থাকেন। তাতেও নানা ধরনের সমস্যা হয়। সড়ক ও জনপথের জায়গায় যেসব হাট-বাজার উচ্ছেদ করা হয়, কিছুদিন পর দেখা যায়, সেগুলো আবার বসছে। হাটবাজারের ট্রাফিক এড়াতে অনেক সময় লিংক রোড করে দেয়া হয়। এই রোডকে কেন্দ্র করে আবার জীবন-জীবিকার কার্যক্রম শুরু হয়, যা হওয়া উচিত নয়। আইন অনুযায়ী, মহাসড়কের প্রান্তসীমা থেকে ১০ মিটারের মধ্যে নিজের জমি হলেও স্থাপনা করা যাবে না। এই ক্ষেত্রে সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে অনুমতি নিয়ে করতে হবে। এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ করা গেলে এই অবস্থার অনেকটা উন্নতি হবে।

            জানা গেছে, নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সড়ক ও মহাসড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী অবৈধ হাট-বাজার, স্থাপনা ও পার্কিং অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এক বছর আগে নির্দেশ দিয়েছিলেন দেশের উচ্চ আদালত। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগই নেয়নি। হাইওয়ে পুলিশের এক তথ্য বলা হয়েছিল, মহাসড়কে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থায়ী ও অস্থায়ী হাট-বাজারের সংখ্যা আড়াই শতাধিক। এসব হাট-বাজারে আসা ছোট ছোট যানবাহন ও পণ্যবাহী যানবাহনের কারণে তীব্র আকার ধারণ করছে যানজট। মাঝেমধ্যে যেই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। সড়কের দু’পাশে ১০ মিটারের মধ্যে হাট-বাজার কিংবা স্থায়ী বা অস্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা ২০২১ সালের মহাসড়ক আইনে দন্ডনীয় অপরাধ। আইনটি প্রয়োগ করতে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা বিভিন্ন সময়ে মহাসড়কের আশপাশে থাকা হাট-বাজার ও অবৈধ অবকাঠামো অপসারণও করেন। তবে প্রকৌশলীদের অভিযোগ, অপসারণের মাস খানেকের মধ্যে পুনরায় এ ধরনের স্থাপনা গড়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ হাটবাজার, স্থাপনার কারণে বিশৃঙ্খল ও দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে উঠেছে দেশের সড়ক-মহাসড়ক। সড়কগুলোয় প্রয়োজনীয় সাইন সিগন্যাল না থাকা, নকশাগত ত্রুটি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। আবার ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ব্যাটারি রিকশা, ইজিবাইকসহ অযান্ত্রিক যানবাহনের উন্টো পথে চলাচল, গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাসহ নানা ব্যবস্থাপনাগত কারণেও ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

            এ প্রসঙ্গে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. সামছুল হক বলেন, মহাসড়কের পাশে বাজারভিত্তিক কর্মচাঞ্চল্য কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের দেশের মহাসড়কগুলো আদতে মহাসড়ক নয়। মহাসড়কের মানদন্ডে রাস্তার অন্তত ১০০ মিটারের মধ্যে হাটবাজার কোনোভাবেই যায় না। কোথাও একবার বাজার গড়ে উঠলে সেটি অপসারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সড়কের পাশে গড়ে ওঠা হাট-বাজার অপসারণ করার পাশাপাশি আইনটি সংশোধন করে রাস্তার অন্তত ১০০ মিটারের মধ্যে হাট-বাজার গড়ে তোলার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করার পরামর্শ দেন তিনি।

            সড়ক ও জনপথ বিভাগ চট্টগ্রামের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল কাশেম চৌধুরী বলেন, মহাসড়কের উপর যত্রতত্র হাট-বাজার বসানো, পার্কিংয়ের ফলে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে। মহাসড়ক আইনে এসব বাজার বা স্থাপনা সম্পূর্ণ অবৈধ। এসব বাজারের কারণে নিরাপদ মহাসড়ক গড়ার উদ্যোগ সফল হচ্ছে না।

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *