
স্টাফ রিপোর্টার॥ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক লাইভে অপ-প্রচার, হুমকি, শারীরিক এবং গাড়িতে হামলার অভিযোগে কুমিল্লার বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ ৩য় আদালতে ১৫ জন বিবাদীর বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকার এক মানহানির মোকদ্দমা দায়ের করা হয়েছে।মামলাটি রুজু করেন, কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জ উপজেলার কেয়ারী গ্রামের বাসিন্দা এবং লাকসাম থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া স্বয়ং। তদপুরি, তিনি বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন দ্বৈত নাগরিকও বটে!

মামলার আর্জি ও বাদী শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া’র ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত ৩০ বছর যাবত মাঝেমধ্যে দেশের বাইরে যাতায়াত করে থাকলেও তিনি লাকসাম থেকে প্রকাশিত সরকারি মিডিয়াভুক্ত সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কারণে আইনানুগ বিধি অনুযায়ী কুমিল্লার বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মহোদয়ের অবগতি সাপেক্ষে কেবল ৬ মাসের কম সময়ের জন্যেই বিদেশে যাওয়া-আসা করে থাকছেন। উপরন্তু, শহীদুল্লাহ ভূঁইয়ার অপর দুই ভাইও প্রবাসে রয়েছেন বিগত ৪০ বছর যাবত। সেই কারণেই যৌথ সংসারের স্বার্থে সুযোগমতো এবং সরকারি মেয়াদকালর মধ্যেই প্রায়ই দেশে আসা-যাওয়া করে তিনি লাকসামে ও কেয়ারী গ্রামের পারিবারিক সহায়-সম্পত্তি, সংসার-ধর্ম ইত্যাদিও তত্বাবধান করে থাকেন।

শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া জানান, “মূলত: নিজের পিতৃভূমি কেয়ারী গ্রামে নিয়মিত নিজস্ব কেউ বসবাস না করার কারণে দীর্ঘদিন থেকেই পরিবারের মালিকানাধীন বাপ-দাদার আমলের সেখানকার ঘর-বাড়ি, পুকুর-জাঙ্গাল ও তৎসংলগ্ন জায়গা-সম্পত্তি ইত্যাদির নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে নানা সমস্যা ও সংকট বিরাজ করে থাকছে। বিভিন্ন সময়ে আম-কাঠাল, নারিকেল-সুপারি, পুকুরের মাছ ইত্যাদি অনেক কিছুই স্থানীয় লোকজনেরা লুটেপুটে খাচ্ছেন। সেহেতু, এ সবের রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে উক্ত মামলার বাদী শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া ২০২৫ সালের ২১শে এপ্রিল রোজ সোমবার সকাল ১০/ ১১টার সময় উল্লেখিত বৃটিশ আমলের বাড়ির আগ দরজায় চিহ্নিত পূর্ব সীমানায় অবস্থিত বিল্ডিং সম্মূখে ১টা বাউন্ডারি বেড়া রিপেয়ারিং করার উদ্দেশ্যে লাকসামের বাসা-বাড়ি ও দোকানপাট থেকে বেশ কিছু জালি তারের বেড়া, কংক্রিট খুঁটি এবং কাজ করার জন্যে ৫/৬ জন কারিগর লোকজনসহ লাকসাম পৌরসভার গুন্তি গ্রামের কন্ট্রাক্টর মৌলভী আবদুস সাত্তার এবং নিজস্ব ড্রাইভার সোহাগকে নিয়ে মনোহরগঞ্জ উপজেলার কেয়ারী গ্রামের বাড়িতে পৌঁছান।
এরপর, কিছুক্ষণের মধ্যে কাজের লোকজন পূর্ব সিদ্ধান্ত মোতাবেক জনসাধারণ ও যানবাহন চলাচলের সুবিধার্থে আ’জীবনের সেই ১৪–১৫ ফুট প্রশস্ত রাস্তা সম্পূর্ণ খোলা রেখে ১৯৯০ সালে পুনঃনির্মিত নিজস্ব ৪ হাজার স্কয়ার ফিটের বিল্ডিং আঙ্গিনা এবং পার্শ্ববর্তী শৈশবের স্মৃতি- সেই আপন ভিটেমাটির এরিয়া সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে দক্ষিণ পাশে জালি তারের আরেকটি বাউন্ডারি বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
এমতাবস্থায়, ঘন্টা খানেকের মধ্যেই হঠাৎ বাড়ির পশ্চিম-দক্ষিণ দিকের বাসিন্দা মামলার ১ নং ও ২ নং বিবাদী যথাক্রমে আল-আমীন ও মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে আনুমানিক ১০/ ১৫ জন নারী পূরুষ প্রায় একসঙ্গে মামলার বাদী শহীদুল্লাহ ভূঁইয়াদের বিল্ডিং সম্মূখে উপস্থিত হয়ে মাইরমুখি সন্ত্রাসী কায়দায় অতর্কিতভাবে নানা গালিগালাজ ও হুমকি-ধমকি দিয়ে বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী ভাঙচুর এবং সীমানা বেড়ার খুঁটি সমূহ উপড়ে ফেলতে থাকেন।
তদপুরি, এহেন অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির পাশাপাশি কিছু ক্ষণের মধ্যেই মামলার প্রধান বিবাদী আল-আমিনের নেতৃত্বে তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে ২ নং বিবাদী মিজানের সহযোগীতায় একাধিকবার স্যোশাল মিডিয়ায় লাইভ ভিডিও সম্প্রচার করে বাদীর বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বক্তব্য প্রচার করেন।
ফেসবুকে এসব লাইভ ভিডিওতে বাদী ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ ও সম্মানহানিকর মন্তব্য করা হয়, যা অল্প সময়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তদপুরি, এহেন মিথ্যা প্রচারনার কারণে আপনজনের মধ্যে মারাত্মক টেনশনের সৃষ্টি হওয়ায় মামলার বাদী শহীদুল্লাহ ভূঁইয়ার মোবাইলে দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য ফোন আসতে থাকে।
বাদীর অভিযোগ, আ’জীবনের সন্ত্রাসী খাছিয়তের বিবাদীরা তাদের বিল্ডিংয়ের সামনে উপস্থিত হয়ে বেআইনিভাবেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে এসে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করে তাঁর নিজের এবং পরিবারের সামাজিক ও পেশাগত সম্মান মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছেন। ফলে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশে ও প্রবাসে অবস্থানরত তাঁর আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের মাঝেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সেহেতু, উল্লেখিত আল-আমিন ও মিজান মিয়াসহ আপাতত: ১৫ জনকে উল্লেখিত মামলার মূল বিবাদী করা হয়েছে।
তাছাড়া,পাশাপাশি মানহানিকর কনটেন্ট অপসারণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সিকেও মামলায় পক্ষভুক্ত করা হয়েছে।
উক্ত মামলায় সুখ্যাতির বিনষ্ট করায় বিবাদীদের বক্তব্য সম্বলিত আধেয় বাদীর জন্য মানহানির ঘোষণা করত: বাদীর উল্লেখিত ক্ষতিপূরণে বিবাদীদের প্রতি সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন তৎসহ দে: কা: বি: এর ১৯ ধারা প্রযোজ্য দেওয়ানি অন্যান্য আইনের বিধান মতে আদেশ প্রার্থনা বাবদ তায়দাদ নং দশ কোটি টাকা মাত্র উল্লেখ করা হলো।
এ ব্যাপারে বাদীপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট সামছুল আলম আদালতকে জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো, হুমকি দেওয়া এবং ব্যক্তিগত সম্মান ক্ষুন্ন করার ঘটনা প্রচলিত আইন ও ডিজিটাল আইনবিধির পরিপন্থী। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে বাদীর সামাজিক ও পেশাগত সুনামের যে ক্ষতি হয়েছে, তা অর্থমূল্যে নিরূপণ করা কঠিন হলেও প্রাথমিকভাবে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের ডিক্রি প্রার্থনা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ পাস হওয়া ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’-এর ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, “যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তাহলে ওই ব্যক্তির এমন কর্মকাণ্ড হবে একটি অপরাধ। এর জন্য তিনি অনধিক ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।”
আদালত উক্ত মামলার আরজি গ্রহণ করে বিবাদীদের প্রতি সমন জারির আদেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানহানিকর ভিডিও ও কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিটিআরসি-কে নির্দেশনার আবেদন বিবেচনায় নিয়েছেন।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া কিছুদিনের জন্যে দেশের বাইরে থাকার কারণে সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ জানান, কুমিল্লার বিজ্ঞ জেলা জজ ৩য় আদালতের সেরেস্তাদার কর্তৃক ইতোমধ্যেই বিবাদীদের ঘরে-বাড়িতে সরেজমিনে উল্লেখিত মানহানির মামলার পরবর্তী তারিখে হাজির হওয়ার জন্যে সমন জারির কাজ সম্পন্ন করেছেন।
এখানে উল্লেখ থাকে যে, বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৯ অনুযায়ী বাংলাদেশি নাগরিকদের বাক্স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে, কোনো ব্যক্তিকে তার সম্মানহানি বা সুনাম নষ্ট করার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো কথা বলার অধিকার একজন নাগরিককে দেওয়া হয়েছে।
মূলতঃ বহুল প্রচারিত সরকারি ডিএফপিভুক্ত সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা পত্রিকার সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়ার দায়েরকৃত উল্লেখিত মানহানিকর মামলাটি বর্তমানে কুমিল্লা আদালত অঙ্গনে একটি আলোচিত মামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উল্লেখ থাকে যে, মামলার বিবাদীগণকে অদ্য ২০/০৪/২০২৬ ইং তারিখ রোজ সোমবার সকাল ১০ ঘটিকার সময় স্বয়ং কিংবা উপযুক্ত মতে উপদেশ প্রাপ্ত ও মোকদ্দমা সংক্রান্ত আবশ্যকারীর সকল প্রশ্নের উত্তরদানে সক্ষম কোন উকিলের দ্বারা অথবা ঐ সকল প্রশ্নের উত্তরদানে সক্ষম অন্য কোন ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়া উল্লেখিত আদালতে উপস্থিত হওয়ার জন্যে সমনে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।