
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মঙ্গলবার ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ঘোষিত ঐতিহাসিক ১৯ দফা কর্মসূচি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
১৯৭৮ সালে বিএনপির আত্মপ্রকাশের সময় ঘোষিত এই কর্মসূচিকে দলটির রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক নীতি-কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও ১৯ দফার বিভিন্ন বিষয় এখনো প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন দলটির প্রবীণ নেতারা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
১৯ দফার মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল জাতীয় আত্মনির্ভরতা, গ্রামীণ উন্নয়ন, জনগণের অংশগ্রহণ এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা। কর্মসূচির প্রথম দফায় দেশের সার্বভৌমত্ব যেকোনো মূল্যে রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় দফায় জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সমাজতন্ত্র—এই চার সাংবিধানিক মূলনীতির কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে সমাজতন্ত্রের অর্থ হিসেবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
তৃতীয় ও চতুর্থ দফায় প্রশাসনের প্রতিটি স্তর এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে আত্মনির্ভরতা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ধর্ম, বর্ণ ও মতাদর্শের পার্থক্য নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার সংরক্ষণ এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি জোরদারের বিষয়টিও ১৯ দফায় গুরুত্ব পেয়েছে।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির বিকাশের পাশাপাশি বন্যা ও খরার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নিম্নভূমি ও বদ্বীপাঞ্চলে কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করে উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা এবং দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
১৯ দফার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল গ্রামীণ উন্নয়ন। শহর ও গ্রামের বৈষম্য কমানো, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণের ওপর এতে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজননস্বাস্থ্য কর্মসূচির মাধ্যমে জনসংখ্যাকে স্থিতিশীল রাখার নীতিও কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এ ছাড়া দুর্নীতি দমন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শ্রমিকের অধিকার সংরক্ষণ, সিভিল সার্ভিস সংস্কার, ভূমি সংস্কার, বেসরকারি খাতে প্রণোদনা এবং যুবসমাজের ক্ষমতায়নের মতো বিষয়ও ১৯ দফায় স্থান পেয়েছে।
নারীর অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নের মূলধারায় নারীদের সম্পৃক্ততা এবং তাদের আর্থসামাজিক কল্যাণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর জিয়াউর রহমান তাঁর সরকারের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক নীতি এবং দিকনির্দেশনা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯ দফা গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি এই কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন।
দলটির নেতাদের দাবি, দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর বিএনপি আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ফিরে এসে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে জিয়াউর রহমানের সেই নীতি ও দর্শনকে অনুসরণ করছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে তাই ১৯ দফা কর্মসূচিকে বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।