ফুলবাড়ীর কয়লা: মাটির নিচের সম্পদ ঘিরে দুই দশকের টানাপোড়েন

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ থেমে আছে প্রায় দুই দশক ধরে। কিন্তু প্রকল্প ঘিরে বিতর্ক ও তৎপরতা থামেনি। এশিয়া এনার্জি নাম বদলে জিসিএম রিসোর্সেস নামে লন্ডনভিত্তিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সময়ে ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে অগ্রগতির দাবি তুলেছে। একই সময়ে লন্ডনের শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির শেয়ারের দরও ওঠানামা করেছে।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ফুলবাড়ী কয়লাখনি উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে জিসিএম রিসোর্সেসের বর্তমান কোনো কার্যকর সম্পর্ক নেই। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি খনি উন্নয়নের কর্মপরিকল্পনা জমা দেয়। পরে ২০০৬, ২০০৭ ও ২০১২ সালে তিনটি পৃথক সরকারি কমিটি প্রকল্পটি নিয়ে পর্যালোচনা করে। এসব কমিটির প্রতিবেদনে ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে নেতিবাচক মতামত দেওয়া হয়।

বিএইচপির হাত ধরে শুরু

ফুলবাড়ী কয়লাখনির ইতিহাসের শুরু ১৯৯৪ সালে। ওই বছরের ২০ আগস্ট অস্ট্রেলিয়ার খনি প্রতিষ্ঠান বিএইচপির সঙ্গে দিনাজপুরে কয়লাসম্পদ অনুসন্ধানের লাইসেন্সসংক্রান্ত চুক্তি করে বাংলাদেশ সরকার। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে ফুলবাড়ীতে উল্লেখযোগ্য কয়লাসম্পদের সন্ধান পায় বিএইচপি।

তবে ১৯৯৭ সালে এশিয়া এনার্জির কাছে লাইসেন্স হস্তান্তর করে বাংলাদেশ থেকে সরে যায় বিএইচপি। এরপর ফুলবাড়ী প্রকল্পের নেতৃত্বে আসে এশিয়া এনার্জি।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ২৮ জানুয়ারি ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে সমীক্ষা ও কর্মপরিকল্পনার জন্য খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো—বিএমডির কাছ থেকে দুই বছরের অনুমোদন পায় এশিয়া এনার্জি। ওই অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয় ২০০৬ সালের ২৭ জানুয়ারি।

তবে এশিয়া এনার্জির ঢাকার কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি এখনো নিয়মিত লাইসেন্স ফি ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন বিএমডির কাছে জমা দিয়ে আসছে।

উন্মুক্ত খনন ঘিরে আন্দোলন

২০০৪ সালে অনুমোদন পাওয়ার পর ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নেয় এশিয়া এনার্জি। এতে পরিবেশ, কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়।

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে ওঠে। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায় ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট। ফুলবাড়ীর খনি এলাকায় আন্দোলনকারীদের সমাবেশে তৎকালীন বিডিআরের গুলিতে স্থানীয় তিন ব্যক্তি নিহত হন। আহত হন দুই শতাধিক মানুষ।

ঘটনার পর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তৎকালীন সরকার একটি চুক্তি করে। চুক্তিতে এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সেই ঘটনার স্মরণে প্রতিবছর ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ী দিবস পালন করা হয়।

নাম বদলাল, প্রকল্পের দাবি বদলায়নি

এশিয়া এনার্জি ২০০৪ সালে লন্ডনের বিকল্প বিনিয়োগ বাজার—এআইএমে তালিকাভুক্ত হয়। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় জিসিএম রিসোর্সেস। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানির সম্পদের বিবরণে এখনো ফুলবাড়ী কয়লাখনির তথ্য উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এশিয়া এনার্জি বাংলাদেশ।

ফুলবাড়ী আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, খনি প্রকল্পের সম্ভাবনা দেখিয়েই দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে ব্যবসা করছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের প্রশ্ন, প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের কোনো সরকারের কাছ থেকে কার্যকর অনুমোদন না থাকলেও কীভাবে ফুলবাড়ীর কয়লাকে কোম্পানির সম্পদ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

শেয়ারবাজারে নতুন করে আলোচনায়

গত কয়েক বছরে জিসিএমের শেয়ারের দর ছিল নিম্নমুখী। পরে চীনের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়নাকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত করে কোম্পানিটি। ফুলবাড়ী কয়লাখনির কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে ২০২০ সালে পাওয়ার চায়নার সঙ্গে চুক্তি করে এশিয়া এনার্জি।

এরপর কয়লা উত্তোলন নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা শুরু হলে কোম্পানিটির শেয়ারদরও বাড়তে থাকে। তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে জিসিএমের শেয়ারের দাম ২ দশমিক ৮৬ পেন্স থেকে বেড়ে ১৭ পেন্সে উঠেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেয়ারের দর ছিল প্রায় দেড় পেন্স।

ফুলবাড়ী প্রকল্প নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক কোনো ইঙ্গিত এলেই শেয়ারের দর বাড়ছে—এমন অভিযোগ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ফুলবাড়ী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।

অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদের ভাষ্য, বিএনপি সরকার একসময় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কয়লা উত্তোলন না করার চুক্তি করেছিল। এখন একই প্রকল্প নিয়ে নতুন করে কয়লা উত্তোলনের আলোচনা হলে তা ওই চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। তাঁর মতে, ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলন জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধান নয়; বরং এতে বিদেশি কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থই বেশি উপকৃত হতে পারে।

সরকারের অবস্থানই মূল প্রশ্ন

ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে দুই দশকের বেশি সময় ধরে একদিকে রয়েছে সরকারি কমিটির নেতিবাচক মতামত, অন্যদিকে কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারাবাহিক দাবি। ফলে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—ফুলবাড়ীর কয়লাকে ঘিরে বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থান আসলে কী।

মাটির নিচে থাকা কয়লা এখনো উত্তোলন হয়নি। কিন্তু সেই কয়লাকে ঘিরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, পরিবেশগত ঝুঁকি, স্থানীয় মানুষের আন্দোলন এবং আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারের ব্যবসা—সব মিলিয়ে ফুলবাড়ী প্রকল্পের বিতর্কও শেষ হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বদেশ রেস্তোরাঁ এন্ড পাটি সেন্টার