মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানি বিলেই বাড়তি ৪-৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়

চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে সরকারের জ্বালানি আমদানি ও বিল পরিশোধে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সব ধরনের উৎসের মধ্যে সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আজ রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে বিভিন্ন উৎসের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় প্রয়োজন। সৌরশক্তিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বাজেটেও নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এখন এ খাতে বড় পরিসরে বিনিয়োগে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে স্থানীয় বিনিয়োগের গতি বাড়ানো ছাড়া উল্লেখযোগ্য বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ সম্ভব নয়। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথে যত বাধাই থাকুক, সেগুলো দূর করতে সরকার কাজ করছে।

তিনি বলেন, সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কমানোর কথা বলা সহজ হলেও বাস্তবায়ন বেশ কঠিন। তবু বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকার এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কথাও উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব সমস্যা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। তবে জ্বালানি খাতে অন্তত তিন মাসের মজুত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।

আর্থিক খাত পুনরুদ্ধারে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে পারলে উদ্যোক্তারা ঋণ সহায়তা পাবেন। তবে প্রণোদনা বিতরণে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হবে না।

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হলে সরকারের উন্নয়ন ও সংস্কার উদ্যোগগুলো সফল করা কঠিন হবে। এ ক্ষেত্রে কর ব্যবস্থার অটোমেশনের কোনো বিকল্প নেই।

অর্থায়নের প্রচলিত উৎসের বাইরে বিকল্প ব্যবস্থা বাড়াতে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। শিগগিরই এ উদ্যোগের সুফল দেশবাসী পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী।

সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি ব্যবসা ও কর ব্যবস্থায় হয়রানি কমানোর ওপর জোর দেন।

তিনি খেলাপি ঋণ কমাতে কাঠামোগত সমস্যা সমাধান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কারের বাস্তবায়ন তদারকিতে ‘ইকোনমিক রিফর্ম এক্সিলারেশন ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাব দেন।

আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশে বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় ব্যবসার ব্যয় বেড়ে গেছে।

পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার নীতিমালা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধানের কথা তুলে ধরে বলেন, উচ্চ শুল্কহার স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতি ও পণ্যের দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হলে কর আহরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি বাজেটের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের সঙ্গে মুদ্রানীতির সমন্বয় না থাকায় মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন।

সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৬ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এ পরিস্থিতিকে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়।

অনুষ্ঠানে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানসহ বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা, ব্যবসায়ী সংগঠন ও আর্থিক খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বদেশ রেস্তোরাঁ এন্ড পাটি সেন্টার