
দেশের ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে এখনো কাটেনি আস্থার সংকট। একদিকে এসব ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে কমেছে প্রবাসী আয়ও। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৬-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে দেশের ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের আমানত কমেছে ৪ হাজার ২০১ কোটি টাকা।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের জুন শেষে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে আমানত কমেছে প্রায় ১ দশমিক ০৭ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত কমার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া। এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর্থিক সংকটে থাকা এসব ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থার ঘাটতিও আমানত কমার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে।
একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকে গ্রাহকদের প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা আমানত রয়েছে, যা পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের ৩৬ শতাংশের বেশি। এসব ব্যাংকের গ্রাহকদের অনেকে প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ উত্তোলন করতে না পারায় নতুন করে আমানত রাখতেও আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার কারণে এসব ব্যাংকের গ্রাহকদের উত্তোলনেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে আমানত রেখে টাকা আটকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে। এর বিপরীতে ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
এর পাশাপাশি আগের সরকারের সময়ে কয়েকটি ইসলামি ব্যাংক থেকে ঋণের নামে বিপুল অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে বের করে নেওয়ার অভিযোগও গ্রাহকদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন ও এস আলম গ্রুপকে ঘিরে বিতর্ক ব্যাংকটির পাশাপাশি পুরো ইসলামি ব্যাংকিং খাতের ওপরই প্রভাব ফেলেছে।
শুধু আমানত নয়, ইসলামি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে আসা প্রবাসী আয়েও বড় পতন দেখা গেছে। ২০২৬ সালের জুনে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৪৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ২০২৫ সালের জুনে এসেছিল ৬০ কোটি ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ২৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, কিছু প্রবাসীর মধ্যে এসব ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে।
তবে সব সূচকে নেতিবাচক পরিস্থিতি নেই। আমানত কমলেও ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বেড়েছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে এসব ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪২ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। আগের বছরের জুনে যা ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে বিনিয়োগ বেড়েছে ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
মোট বিনিয়োগের ৪১ শতাংশের বেশি রয়েছে শিল্প খাতে। ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতেও হয়েছে ৩০ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ।
আমানতের বড় অংশ এখনো মুদারাবাভিত্তিক বিভিন্ন আমানত স্কিমে রয়েছে। মোট ইসলামি ব্যাংকিং আমানতের প্রায় ৮৭ শতাংশই এসব স্কিমের আওতায়। অন্যদিকে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে।
এদিকে ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানেও। ২০২৬ সালের জুন শেষে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন ৪২ হাজার ৬১২ জন। ২০২৫ সালের জুনে এ সংখ্যা ছিল ৪৬ হাজার ৪৬৮ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কর্মী কমেছে ৩ হাজার ৮৫৬ জন।
বর্তমানে দেশে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের সংখ্যা ১০টি। এসব ব্যাংকের মোট শাখা প্রায় ১ হাজার ৭০০টি। একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংক নিয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে খাতটিতে বড় ধরনের পুনর্গঠনের কাজ চলছে।
২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একীভূত পাঁচ ব্যাংকের নেটওয়ার্ক নিয়ে নতুন ব্যাংকটির অধীনে রয়েছে ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ৯৭৫টি এটিএম বুথ।
ফলে আমানত ও রেমিট্যান্সে পতনের পাশাপাশি বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি—এই মিশ্র চিত্রই বর্তমানে দেশের ইসলামি ব্যাংকিং খাতের বাস্তবতা তুলে ধরছে। খাতটির স্থিতিশীলতা ফেরাতে গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠন এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক পুনরুদ্ধার এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। Courtesy: Prothom-alo