সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ পত্রিকা ও সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া’র এক অপ্রকাশিত লড়াই: (পর্ব-১)

              ।। জসীম উদ্দীন অসীম।।

১৯৯০ এর দশকের প্রথম থেকে কুমিল্লা আর ঢাকার বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করলেও ওসব লেখা ছিল সাহিত্যকেন্দ্রিক। কিন্তু ’৯০ এর দশকের মাঝামাঝি থেকে কুমিল্লায় পেশাগতভাবেই সাংবাদিকতা শুরু করি। শুরুর পত্রিকা ছিল ‘সাপ্তাহিক আমোদ’। তার পরের পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’। এই দুই পত্রিকা থেকে তখনকার সময়ে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টাকা বেতন পেতাম। ‘লাকসামবার্তা’র চাকরিটি পেয়েছিলাম ‘সাপ্তাহিক আমোদ’ পত্রিকার সম্পাদক বাকীন রাব্বীর মাধ্যমে।

              আমার সাংবাদিক বন্ধুদের অনেকেই তখন ঢাকা থেকে প্রকাশিত বহুল প্রচারিত বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করে অনেক খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিন্তু ওসব পত্রিকা থেকে ওই সময়ে জেলা শহরের সংবাদ প্রতিনিধিদের বেতনভাতাও তেমন দেয়া হতো না। কিন্তু আমাকে ওই সময়ের বাস্তবতায় মাস শেষে একটি ভালো টাকা বেতন পেতেই হতো! ২০০০ সালের আগে ‘দৈনিক রূপসী বাংলা’য়ও চাকরি করেছি। প্রতিদিন রাতেই ছিল অফিসে আমার কাজ। রাত প্রায় ১১/১২টা অবধি।

              ওই সময়টায় আমি ঢাকার একটি দৈনিকেও সংবাদ পাঠিয়েছি। কিন্তু তারা বেতন-ভাতা কিছুই দিতো না। কেবল সংবাদই ছেপে যেত। তাই একবার গেলাম ঢাকার অন্য পত্রিকায়। খুবই জনপ্রিয় ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’ অফিসে। দেখা করলাম ‘মফস্বল সম্পাদক’ দিলীপ দেবনাথের সঙ্গে। তিনি একদা বাম রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

              বললাম, দৈনিক জনকণ্ঠের কুমিল্লা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে চাই। তিনি বললেন, আপনি কী করেন?

: সাংবাদিকতা।

: বেতন পান?

: পাই।

: কত?

: তিন পত্রিকায় কাজ করি। প্রতি মাসে প্রায় ৫ হাজার টাকা পাই।

: ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’ পত্রিকা কুমিল্লা প্রতিনিধিকে কোনো বেতন দেবে না।

আমি বললাম, তাতেও রাজি।

বললেন, অন্য পত্রিকায় কাজ করা চলবে না।

: তাতেও রাজি।

: তারপর আপনি কী করবেন! চুরি করবেন?

আমি চুপ করে থাকলাম।

বললেন, আপনার বাবা কী করেন?

: সরকারি চাকরি করতেন। এখন অবসরপ্রাপ্ত।

: বিয়ের উপযুক্ত বোন আছে?

: দুইজন।

: আপনি এখন চলে যান। সময় নষ্ট করবেন না। স্থানীয় পত্রিকায় কাজ করেও আপনি খুবই ভালো আছেন।

ফিরে এলাম। আবারো কুমিল্লার পত্রিকাগুলোতে কাজ করতে লাগলাম। কিন্তু মন পড়ে থাকলো ঢাকার পত্রিকার দিকেই। অথচ কুমিল্লার পত্রিকাগুলোতে চাকরি না করলে টাকাও পাচ্ছি না।

তখন ‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ পত্রিকাই মাস শেষে বেতন দিতো দুই হাজার টাকা। আজকের বাজার মূল্যে এ টাকা অল্প টাকা নয়। সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া থাকতেন প্রায়ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। আমেরিকায়। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিষ্ট্রেট (জেলা প্রশাসক)-এর অবগতি সাপেক্ষে তখন তাঁর নিকটাত্মীয় তোফায়েল আহমেদ পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি প্রতি সপ্তাহে সংবাদ আর ছবি নিয়ে চলে আসতেন কুমিল্লা শহরে। ‘সাপ্তাহিক আমোদ’ অফিসের দোতলায় হতো কাজ। কবি আবদুল হালিম ছিলেন কম্পোজিটর। তখনো চলতো ট্রেসিং পেপার কেটে কেটে হাতের পেস্টিং। অফিস ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। কম্পিউটারের জন্য এসির ব্যবস্থা করা হলেও কর্মসূত্রে তা আমরাই বেশিরভাগ সময়ে ভোগ করেছি। নিচতলায় ‘আমোদ’ সম্পাদক বাকীন রাব্বী (তখনকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক) ও তাঁর অন্যান্য রিপোর্টারগণ কাজ করতেন। অবশ্য যেদিন আমি ‘সাপ্তাহিক আমোদ’ এর কাজ করেছি, ওসব দিনের বেশিরভাগ সময়েই নিচের তলার অফিসে থেকেছি। কখনো কখনো ‘লাকসামবার্তা’ পত্রিকার সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া আমেরিকা থেকে ফোন করে আমাদের প্রায় সবারই খবরা-খবর নিতেন। তিনি কর্মসূত্রে  আমেরিকায় বসবাস করলেও আসলে তাঁর মন পড়ে থাকতো বাংলাদেশেই।

              আজকের সময়ে ওই সময়ের বিচার করা সম্ভব নয়! তখনো কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি কুমিল্লা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা ‘কুমিল্লা ইপিজেড’। কুমিল্লার যে পুরাতন বিমান বন্দর এলাকায় প্রায় রাতেই ‘বাকীন রাব্বী’ ভাই আমাকে মোটর সাইকেল চালানো শেখাতে নিয়ে যেতেন, ওই এলাকাতেই একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে ‘কুমিল্লা ইপিজেড’ এটা হয়তো তখনো ওভাবে ভাবিনি, যদিও ১৯৯৬ সাল থেকে কুমিল্লা ইপিজেড প্রতিষ্ঠা নিয়ে ‘সাপ্তাহিক আমোদ’ ও ‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ পত্রিকায় অনেক সংবাদ ও সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছে।

এখন কুমিল্লা ইপিজেডের যেখানে দেশি-বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো নিজস্ব পণ্য উৎপাদন করছে, চীন, জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত, বৃটেন, ইতালি, নেদারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, হংকং, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশ শিল্পে বিনিয়োগ করেছে, একসময় এসব শত শত একর জমিতে বছরের অধিকাংশ সময়েই ছিল শুধুমাত্র ধানের চাষ। ওই গোমতি নদী আর ধান চাষবেষ্টিত কুমিল্লা শহরে একদা আমি যে সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম, তার অনেক নেপথ্য বা ইতিবৃত্তও রয়েছে।

              একদা ঢাকায় পড়তে গিয়ে ডেমরা এলাকার মাতুয়াইলে ছিলাম প্রায় দুই বছর। তখন যাত্রাবাড়িতে, দনিয়ায়, সারুলিয়ায়, গেন্ডারিয়ায়, সদরঘাটে, খিলগাঁওয়ে, খিলখেতে, সংসদভবন এলাকায়, মতিঝিলে, মিরপুরে, মোহাম্মদপুরে, সূত্রাপুরে, ওয়ারীতে, তেজগাঁওয়ে, শাহবাগে, গুলিস্তানে, বাংলাবাজারে, পল্টনে… যে আমার বিভিন্ন কারণে সময় কেটেছে, ওই আমি ‘আমোদ’ বা ‘লাকসামবার্তা’ পত্রিকায় কাজের সূত্রে কুমিল্লার বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকার সংবাদ ও জনপদের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হলাম। যদিও আমি ওই পত্রিকাগুলোর সমূহ কাজ অফিসে বসেই করেছি, কিন্তু আমার কল্পনারা তখন উড়ে যেত ওই সংবাদসমূহের ঘটনাস্থানগুলোতে। কখনো কুমিল্লার বরুড়া, মুদাফরগঞ্জ, চাঁদপুরের বাবুরহাট, লাকসাম পৌরসভা, বিপুলাসার, খিলাবাজার, চড়িয়াবাজার, ঢালুয়া, মনোহরগঞ্জ, গুণবতীসহ… কত কত এলাকার সংবাদ উড়ে আসতো।

              আসলে ‘লাকসামবার্তা’ পত্রিকাটিতে যখন আমি কাজ শুরু করি, তখনো বাংলাদেশে আত্মপ্রকাশ করেনি ‘দৈনিক প্রথম আলো’র মতো বিপুল বিনিয়োগের অনেক অনেক পত্রিকা, একুশে টেলিভিশন বা ইটিভি’র মতো অনেক নামীদামী টেলিভিশনও। ওই সময়ে কী লড়াই করে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাকে নিয়মিত তাঁর প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে হয়েছে, ওই লড়াই আমি নিজে স্বয়ং দেখেছি। আর আমি যেসব পত্রিকায় চাকরি করেছি, সাপ্তাহিক আমোদ, সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা, দৈনিক রূপসী বাংলা… ওসব পত্রিকা কখনো কোনো কারণ দেখিয়ে তাঁর একটি সংখ্যার প্রকাশনা বা মুদ্রণও বাতিল করতেন না। ‘আমোদ’ কিংবা ‘লাকসামবার্তা’ বছরের ঈদে-চাঁদেই শুধু পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ রাখতেন। বাস্তবিক পক্ষে নিয়মিত প্রকাশনার ক্ষেত্রে জেলা বা উপজেলা থেকে এমন ‘ডেডিকেটেড’ সংবাদপত্র প্রকাশ করা ওই সময়ে ছিল রীতিমত উদাহরণযোগ্যই বটে! (চলবে)

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *