
নগরায়ণের দ্রুত বিস্তারে গত দুই দশকে চট্টগ্রাম নগরীর অসংখ্য পুকুর ও জলাশয় হারিয়ে গেছে। একসময় যেসব জলাশয় নগরের সৌন্দর্য ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, সেগুলোর অনেক জায়গাতেই এখন মাথা তুলেছে বহুতল ভবন। কোথাও আবার পুকুর বা দিঘির নামটি এলাকার পরিচয়ে টিকে থাকলেও বাস্তবে সেই জলাশয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই।
তবে এই বাস্তবতার ব্যতিক্রম চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘি। আড়াই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নগরীর প্রাণকেন্দ্রে টিকে থাকা এই জলাশয় শুধু একটি দিঘি নয়; এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস, রাজনৈতিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং নাগরিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি স্মৃতিচিহ্ন।
আন্দরকিল্লার কাছাকাছি প্রায় ২ দশমিক ৭০ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত লালদিঘির চারপাশ আজ প্রাচীর ও হাঁটার পথ দিয়ে সাজানো। ‘লালদিঘি পার্ক’ নামে পরিচিত এই স্থান ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝে নগরবাসীর হাঁটা, শরীরচর্চা ও অবসর কাটানোর অন্যতম পরিচিত জায়গা।
লালদিঘি নামের পেছনে ইতিহাস ও কিংবদন্তি
লালদিঘির নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানা মত ও লোককথা। ইতিহাসের একটি প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬১ সালে চট্টগ্রামের শাসনভার নেওয়ার পর বর্তমান চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তরের এলাকায় থাকা তহসিল কার্যালয়টি লাল রঙে রাঙানো হয়। ভবনটি পরে ‘লালকুঠি’ নামে পরিচিতি পায়।
এর পূর্ব দিকে থাকা কারাগারও লাল রঙে রাঙানো হয়েছিল বলে সেটি স্থানীয়দের কাছে ‘লালঘর’ নামে পরিচিত হয়। এসব ভবনের পাশে ছিল একটি ছোট পুকুর। প্রচলিত আছে, বিকেলের সূর্যের আলোয় লালকুঠির ছায়া পড়লে পুকুরের পানি লালচে দেখাত। সেখান থেকেই ‘লাল পুকুর’ বা ‘লালদিঘি’ নামের প্রচলন ঘটে বলে ধারণা করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ছোট পুকুরটি সম্প্রসারিত হয়ে বড় দিঘিতে রূপ নেয়।
তবে লালদিঘিকে ঘিরে আরও নানা কিংবদন্তি রয়েছে। লোকমুখে প্রচলিত একটি গল্পে বলা হয়, এক যুদ্ধে ব্যাপক রক্তপাতের কারণে দিঘির পানি লাল হয়ে গিয়েছিল। আবার কারও কারও মতে, ব্রিটিশ আমলে কোনো এক ‘লাল মেমসাহেবের’ সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনার সূত্রে দিঘিটির নাম ‘লালদিঘি’ হয়।
ইতিহাসের সঙ্গে এসব কিংবদন্তির কোনটি কতটা সত্য, তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও এগুলো লালদিঘিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের কল্পনা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
মসজিদ, মাঠ ও পুরোনো নগরকেন্দ্র
লালদিঘির উত্তর পাশে রয়েছে ঐতিহাসিক লালদিঘি শাহী জামে মসজিদ। মসজিদের সঙ্গে জমিদার তকী ইসমাইল মুহাম্মদের নামও জড়িয়ে আছে। একসময় তিনি দিঘিটির দেখভালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরে এর মালিকানা মুসলিম হাই স্কুলের কাছে হস্তান্তর করেন বলে জানা যায়।
ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে উত্তর-দক্ষিণ সড়ক নির্মাণের ফলে তৎকালীন মিউনিসিপ্যাল ময়দান দুই ভাগে বিভক্ত হয়। এর একটি অংশ সাধারণ মানুষের খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। পরবর্তীতে মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে মাঠটি বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে এটি ‘লালদিঘির মাঠ’ নামে পরিচিত।
আন্দোলন-সংগ্রামের স্মৃতিবাহী স্থান
লালদিঘি শুধু একটি জলাধার বা পার্ক নয়, চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন গণসমাবেশ—বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এই এলাকা।
চট্টগ্রামের মানুষের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের নানা অধ্যায় লালদিঘি মাঠকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ের ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিও এই এলাকার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
ফলে লালদিঘির নাম উচ্চারিত হলেই চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংগ্রাম, গণআন্দোলন ও নাগরিক জীবনের বহু স্মৃতি একসঙ্গে সামনে আসে।
ব্যস্ত নগরে স্বস্তির জায়গা
নগরায়ণের চাপে চট্টগ্রামে উন্মুক্ত জায়গা কমে যাওয়ায় লালদিঘির গুরুত্ব এখন আরও বেড়েছে। সকালে এখানে মানুষ হাঁটতে আসেন, কেউ করেন শরীরচর্চা। বিকেলে অনেকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন কিংবা দিনের ব্যস্ততা শেষে কিছুটা সময় নিরিবিলিতে কাটান।
নগরবাসীর কাছে লালদিঘি তাই একই সঙ্গে ইতিহাসের স্মারক এবং দৈনন্দিন জীবনের স্বস্তির জায়গা।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনও ঐতিহাসিক স্থানটির ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে। নগরীর উন্মুক্ত স্থানগুলো সংরক্ষণ, সবুজায়ন, হাঁটার পথ ও বসার ব্যবস্থা তৈরির মাধ্যমে নাগরিকদের জন্য আরও ব্যবহারবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।
ঐতিহ্য সংরক্ষণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
দ্রুত নগরায়ণের যুগে একটি ঐতিহাসিক জলাশয়কে এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকিয়ে রাখা সহজ নয়। লালদিঘির গুরুত্ব শুধু এর পানিতে নয়; এর সঙ্গে মিশে আছে চট্টগ্রামের বহু প্রজন্মের স্মৃতি।
একদিকে এটি প্রাচীন নগরকেন্দ্রের জলাধার, অন্যদিকে আন্দোলন-সংগ্রামের সাক্ষী। একই সঙ্গে এটি আজকের নগরবাসীর জন্য হাঁটা ও অবসর কাটানোর একটি উন্মুক্ত স্থান।
তাই লালদিঘিকে শুধু একটি পার্ক হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেকটাই আড়ালে থেকে যাবে। প্রয়োজন এর জলাধার, পরিবেশ, স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য এবং ইতিহাসকে সমন্বিতভাবে সংরক্ষণ করা।
আড়াই শতাব্দীর ইতিহাস পেরিয়ে আজও টিকে থাকা লালদিঘি যেন চট্টগ্রামকে একটি বার্তাই দেয়—নগর যত আধুনিকই হোক, তার শেকড় ও স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখাও সমান জরুরি। ইতিহাস ও প্রকৃতির এই মিলনস্থলকে যত্নে সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জানতে পারবে বন্দরনগরীর অতীতের গল্প এবং অনুভব করতে পারবে পুরোনো চট্টগ্রামের এক টুকরো আবহ।