
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি পদে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়া প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন অপেক্ষা শুধু ভোট ও ফল ঘোষণার।
একই দিনে রাষ্ট্রপতি পদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়নপত্রও জমা পড়েছে। কোনো প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করলে আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। সে ক্ষেত্রে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ।
সর্বশেষ ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হয়েছিল। ওই নির্বাচনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরপর ক্ষমতাসীন দলগুলোর মনোনীত সাতজন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এবার বিরোধী জোট প্রার্থী দেওয়ায় ফের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
তবে সংসদের বর্তমান আসনসংখ্যার হিসাবে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কার্যত কোনো অনিশ্চয়তা নেই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনসহ বর্তমানে সদস্য রয়েছেন ৩৪৯ জন। এর মধ্যে বিএনপির সদস্য ২৪৭ জন। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের সদস্য ৯০ জন। বাকি সদস্যরা স্বতন্ত্র ও কয়েকটি ছোট দলের।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যে ভোট দেন। ফলে বর্তমান সংখ্যার সমীকরণে মির্জা ফখরুলের জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ভোটের আগে আরও দুই ধাপ
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট বিকেল চারটা। বৈধ প্রার্থী একজন থাকলে তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। আর দুজন প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট বেলা দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোট হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গোপন নয়। সংসদ সদস্যরা ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশাপাশি নিজের নাম ও আসন নম্বরও লিখবেন। বিএনপির চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকায় দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হতে পারে। যদিও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে ভিন্ন আইনি মতও রয়েছে।
প্রায় ১৬ বছর বিএনপির মহাসচিব
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রায় ১৬ বছর বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১১ সালে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হন।
খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং তারেক রহমানের দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার সময়ে বিএনপির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মির্জা ফখরুল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক মামলায় তিনি ছয়বার কারাগারে যান।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পর তিনি বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
সচিবালয়ে বৈঠক, তবে ‘দলীয় বৈঠক’ নয়
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণার আগে গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের ডাকেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকের শুরুতেই তিনি রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত জানান।
পরে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান। এরপর বেলা আড়াইটার দিকে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দীনের কাছে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক ও সমর্থক হয়েছেন বিএনপির দুই জ্যেষ্ঠ নেতা ও সংসদ সদস্য আবদুল মঈন খান এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
মির্জা ফখরুলের প্রার্থিতা ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে সচিবালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক এবং মন্ত্রিসভায় রদবদল নিয়ে আলোচনা হয়েছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা বিষয়টি নাকচ করেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনা হয়নি। মন্ত্রিসভায় রদবদল নিয়ে ছড়িয়ে পড়া খবরে তিনি বিব্রত বলেও জানান।
অলি আহমদের দুটি মনোনয়নপত্র
রাষ্ট্রপতি পদে ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের পক্ষেও দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রথম মনোনয়নপত্র জমা দেন। পরে বিকেল তিনটার দিকে তাঁর পক্ষে আরও একটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদে দুজন প্রার্থীর মোট তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। এর মধ্যে একটি মির্জা ফখরুলের এবং দুটি অলি আহমদের।
অলি আহমদের মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক হয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং সমর্থক এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমীন।
বিরোধী জোটের নেতারা জানিয়েছেন, ফলাফল অনুকূলে না থাকলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হতে না দেওয়া এবং জনগণের কাছে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতেই প্রার্থী দেওয়া হয়েছে।
অলি আহমদ: বিএনপির সাবেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা
কর্নেল (অব.) অলি আহমদ একসময় বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তিনি বীর বিক্রম খেতাব পান। জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। বিএনপি সরকারের সময় একাধিকবার মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
২০০৬ সালে বিএনপি থেকে বেরিয়ে তিনি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) গঠন করেন। পরে জাতীয় নির্বাচনের আগে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে তাঁর দল যোগ দেয়।
মির্জা ফখরুলের তিন পদেই পরিবর্তন
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন ঘোষণার পর বিএনপির মহাসচিব পদে কে আসছেন, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তাঁর মন্ত্রিত্ব ও সংসদ সদস্য পদও শূন্য হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। পরে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তাঁর সংসদীয় আসনটি শূন্য ঘোষণা করে সেখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
বিএনপির নেতাদের ভাষ্য, নতুন মহাসচিব বা ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা হওয়ার অপেক্ষা
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়।
এখন মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং ভোট—এই কয়েকটি আনুষ্ঠানিক ধাপ বাকি। তবে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব বলছে, সব প্রক্রিয়া শেষে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
২০ আগস্টের ভোট তাই শুধু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; একই সঙ্গে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রত্যাবর্তনের দিনও হতে যাচ্ছে।