‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ পত্রিকা ও এর সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়ার এক অপ্রকাশিত লড়াই: (পর্ব-২)

‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ পত্রিকায় চাকরি করেছি প্রায় তিন বছর। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০০ সালের জুন মাস পর্যন্ত। মাসিক বেতন ২ হাজার টাকা। তখন জেলা শহরে এ টাকা একেবারেই অল্প নয়। কারণ তখনো ১০/১২ টাকাতে ১ কেজি মোটা চাউল পাওয়া যেত। আমরা একটি বিল্ডিংয়ের চার রুমের বাসায় ভাড়া থেকেছি মাত্র ১৫০০/-টাকায়। এক হালি মুরগীর ডিম পাওয়া যেত ৭/৮ টাকায়। সুতরাং … ।
তাছাড়া তখন আরও পত্রিকায় চাকরি করেছি। দিন একপ্রকার কেটে যেত। আটকে গেলে তো চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত বাবা আছেনই।
পিআইডি থেকে প্রাপ্ত আইডি কার্ড
প্রায় তিন বছর ধরে যে ‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ পত্রিকায় চাকরি করলাম, এর সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়াকে তিনবছরে দেখতে পেলাম মাত্র তিনবার। কারণ তিনি আমেরিকাপ্রবাসী। দেখা হলো: একবার, যখন চাকরি হলো। তারপর আরেকবার তিনি নিজেই কুমিল্লা শহরেই এসেছিলেন পত্রিকা মুদ্রণের জন্য । সে বার তিনি মোটর সাইকেলে এলেন।
বললেন, কী খাবেন?
আমি বললাম, কিছু একটা খেলেই হলো।
তিনি বললেন, কিছু খেলে তো আর আমার কথা মনে থাকবে না। চলো তোমাকে কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী ‘মাতৃভান্ডারে’র মিষ্টি খাওয়াই।
এই বলেই তিনি মোটর সাইকেলে ছুটলেন ওই মিষ্টি দোকানের দিকে। … ।
আমার মনে হলো যেন বিমানে চড়েছি। কত দ্রুত যে মিষ্টি দোকানে গেলেন।
বড় ভাইতুল্য এই মানুষটির কথায় এবং আচরণে প্রচন্ড তারুণ্য দেখতে পেলাম। সংস্কৃতিজন তো বটেই। ওই গতি বাংলাদেশের নয়। রীতিমত আমেরিকার। থাকেনও ওই দেশেই। কখনো কখনোই বাংলাদেশে আসেন।
কিছুদিন আগেও একবার তাকে বলেছিলাম, ভাই আমেরিকায় কী কাজ করেন?
বললেন, আমেরিকায় যাওয়ার পর New York City’তে ২/৩ বছর পর থেকেই আমি সরকারি TLC (টেক্সি এন্ড লিমোজিন কমিশন)-এর গাড়ি চালিয়েছি। এটা আমেরিকার একটি প্রেস্টিজিয়াস জব। কেননা, খুব সহজেই এ কাজ করার উপায় নেই। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের যথেষ্ট পরীক্ষানিরীক্ষা ও প্রশিক্ষণের পরেই এ দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয় এবং এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকাও জরুরি। যে কেউ ইচ্ছে করলেই এই সরকারি TLC (টেক্সি এন্ড লিমোজিন কমিশন)-এর গাড়ি চালাতে পারবে না। এটা অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ কাজ। এই কাজই আমি বিগত সময়ে করেছি। এবার রিটায়ারমেন্টে আসা পর্যন্ত আমি নিউইয়র্ক সিটির সরকারি TLC (টেক্সি এন্ড লিমোজিন কমিশন)-এর গাড়ি চালিয়েই সংসার-ধর্ম পরিচালনা করে এসেছি।
তৃতীয়বার দেখা হলো তাঁর পত্রিকায় চাকরি ছাড়ার পরে।
তখন তিনি একদিন আমাকে লাকসামে দাওয়াত করলেন। বললেন, তিন বছর তো তুমি আমার কাজও করেছো কুমিল্লা শহরের ‘সাপ্তাহিক আমোদ’ পত্রিকার অফিসে বসে। এবার একদিন আসো ‘লাকসামবার্তা’র অফিস দেখবে। আর দুই ভাই একসঙ্গে মিলে একবেলা খাবার খাবো।
গেলাম। অফিস দেখলাম। তাঁর সাংবাদিকতার কিছু স্মৃতি জানলাম। এত শিক্ষিত আর প্রশিক্ষিত মানুষ, অথচ অহংকার নেই। এমনকি কথা শুরু করবেন এমনই ভঙ্গিতে যে, অনেকে ধারণা করবেন লোকটি কিভাবে সাংবাদিক-সম্পাদক হলো! ভাষাও ঠিক এলাকার আঞ্চলিক ভাষাই ব্যবহার করেন। তাঁর এমন ভাষা ব্যবহারে আমিও একদা বিভ্রান্ত হয়েছিলাম। কারণ গত প্রায় ৩৫ বছর ধরে আমি নিজেও প্রমিত বাংলায় কথা বলায় আনন্দবোধ করেছি।
ঢাকায় থিয়েটার করার সময়ে আমাকে একটি চরিত্র দেয়া হয়েছিল, যার ভাষা ছিল ঢাকাইয়া কুট্টি ভাষা। কোনোভাবেই ওই ভাষা আমি রপ্ত করতে পারিনি। পরে আমাকে অন্য চরিত্র দেয়া হয়েছিল।
‘লাকসামবার্তা’ পত্রিকার সম্পাদক প্রমিত বাংলা কিংবা ইংরেজিতে কথা বলায় দারুণ পারদর্শি হলেও এলাকার মানুষের সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষায় এমনভাবেই কথা বলা শুরু করেন যে, বলাই কঠিন যে, এই মানুষটিই বাংলা-ইংরেজি-আরবী, উর্দু … আরও ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন। এই আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা তাঁর কোনো কৌশল নয়, নিজস্ব প্রাণের সরলতা।
২৫ বছর আগের কথা বলছি। তো সেদিন লাকসাম থেকে ফিরে আসার সময় তিনি আমাকে যাতায়াত ভাড়া দিলেন। তারপর বললেন, আমার আব্বা বয়স্ক মানুষ। অসুস্থও। তোমার গল্প তো বাসায়ও হয়। তোমাকে তিনি একটু দেখবেন।
লাকসাম পৌর এলাকার সেই বাসায় গিয়ে দেখা হলো সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়ার বাবার সঙ্গে। তিনি আমাকে দেখে অনেকটা আবেগপ্রবণই হলেন। বললেন, বাবা তুমি লাকসামে চলে আসো। একসঙ্গে মিলেমিশে পত্রিকাটি করো। আমার ছেলে তো আবার দুদিন পরেই আমেরিকায় উড়াল দেবে। তুমি রাজি হলে বলো কত টাকা বেতন চাও?
আমি এই অভিভাবক মানুষটিকে সেদিন কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারিনি। বললাম, আপনারা যে আমাকে এত স্নেহ করেন, এতেই আমার খুব ভালো লাগছে।
তারপর সরাসরি আর দেখা হয়নি সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়ার সঙ্গে।
কয়েকবছর আগে তিনি জানালেন, তিনি কবে দেশে আসবেন। আমি যেন সুযোগমত দেখা করি। কিন্তু ভুলনশীল মানুষ আমি। অনেক কিছুই ভুলে যাই। এমনকি ঢাকার একটি পত্রিকার অ্যাসাইনমেন্টে একদিন লাকসামের ইউএনও, উপজেলা প্রকৌশলী, পৌর প্রকৌশলী … আরও কয়েক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গেও দেখা করে এলাম। ‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ পত্রিকায় আর যাওয়া হলো না।
লাকসাম উপজেলা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এলাকা। কুমিল্লা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে ডাকাতিয়া নদীর তীরে এই উপজেলাটি অবস্থিত। লাকসামের এ নদী নিয়ে তখনো কত সংবাদ যে এ পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। নদনা খালের বিষয়ে সম্পাদকীয় লিখেছি। লাকসাম পৌরসভার অনেক অসঙ্গতির খবরাখবর ছাপা হতো। ওসব প্রকাশ করতে গিয়ে হয়তো ক্ষমতাধর অনেকেরই বঞ্চনা পত্রিকা কর্তৃপক্ষ সহ্য করেছেন। কিন্তু বরাবরই সব উপেক্ষা করে গণমানুষের কথা বলতে চেয়েছে এ পত্রিকাটি। বলা যায়, গত ৩০ বছর ধরেই তিনি নিজের এই ‘লাকসামবার্তা’ পত্রিকাটি দিয়ে ওই বাণিজ্যের শহরটির পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে তাঁর পত্রিকার লেখনি দিয়ে অব্যাহত লড়াই করেছেন। এ পত্রিকা প্রকাশের আগেও তিনি ঢাকার বিভিন্ন পত্রিকায় সংযুক্ত থেকে সাংবাদিকতা করেছেন। আকস্মিক তিনি সাংবাদিকও হোননি, সম্পাদক তো নয়ই। আজকাল যেমনটি দেখা যায়। তৃণমূল সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে করতেই একদিন তিনি সম্পাদক হয়েছিলেন।
লাকসাম পৌরসভা বর্তমানে একটি প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা। বাংলাদেশের বৃহত্তম পাঁচটি রেলওয়ে জংশনের মধ্যে একটি এখানেই অবস্থিত। নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর জন্মস্থানের কারণেও লাকসাম বেশ পরিচিত। মুদাফফরগঞ্জ, কান্দিরপাড়, গোবিন্দপুর, উত্তরদা, আজগরাসহ কত এলাকার সংবাদ যে এখনো ছাপা হয় এই পত্রিকাটিতে।
১৮৮৩ সালে এদেশে যখন ব্রিটিশ সরকার রেললাইন স্থাপন করেন, তখন দৌলতগঞ্জের উত্তরাংশের উঁচু ভূমিতে লাকসাম রেলওয়ে জংশনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। শৈশব থেকেই এ জংশনের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম আমি, যেহেতু বাবা তখন চট্টগ্রামে চাকরিরত ছিলেন।
২০০৬ সালে ‘বাংলাভিশন টেলিভিশন লিমিটেডে’র একটি অনুষ্ঠানের গাইড হয়েও গিয়েছিলাম লাকসামের অনেক জায়গায়। নবাব ফয়জুন্নেসার জমিদার বাড়িতেও। একবার অতুল কৃষ্ণ রায় চৌধুরীর জমিদার বাড়িতেও যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। সময়সঙ্কটে যাওয়া হয়নি আর।
আমি যে সময়টায় ‘লাকসামবার্তা’ পত্রিকায় কাজ করেছি, তখন পশ্চিমগাঁওয়ের নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজের অনেক সংবাদ আসতো। আরও কত কত সংবাদ। ডাকাতিয়া নদীকেন্দ্রিক সংবাদ তো নিয়মিতই ছিল।
কিছুদিন আগেও একটি বিশেষ প্রয়োজনে কুমিল্লা জেলা কালেক্টরেট লাইব্রেরীতে গিয়েছিলাম, বিশেষ করে ডাকাতিয়া নদীর প্রাচীন তথ্যাদি সংগ্রহ করতে। পাইনি। ডাকাতিয়া নদী একসময় এ জনপদের উপর দিয়ে প্রবল বেগে প্রবাহিত হতো। বর্তমানে নদীটি আবর্জনা আর পলি মাটিতে ভরাট হয়ে শুষ্ক মৌশুমে প্রায় পানিশূন্যই হয়ে পড়ে।
লাকসাম অনেক গুণী মানুষেরও জন্মস্থান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত উপাচার্য প্রফেসর এম শামছুল হককে নিয়ে আমার একাধিক লেখা রয়েছে। তিনি যখন কুমিল্লার প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় (ইউনিক) এর উপাচার্য ছিলেন, তখনো তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। লাকসামের এই মানুষটির অহংবোধ ছিল না। তিনি নব্বইয়ের দশকের শেষদিকেও কুমিল্লার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। ওসব সংবাদ ‘লাকসামবার্তা’সহ আঞ্চলিক বা স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে ছাপাও হতো।
লাকসামের রেলওয়ে জংশন এখনো দেশের অন্যতম বৃহৎ জংশন। লাকসাম রেলওয়ে জংশন প্রায় ৩০০ একর সম্পত্তির উপর ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে একসময় প্রায় ১৭০০ জন শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করত। আজকের সময়ে ভাবা যায় লাকসামের ওইসময়ের অর্থনীতির চাকাও কতটা গুরুত্ববহ ছিল?
আমার বয়স এখন ৫০ পার হয়েছে। জীবনের ২৫/২৬ বছর বয়সে একটি জেলা শহরে বাস করেও সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিলাম। জীবন নিয়ে আমার এ পরীক্ষানিরীক্ষায় সফল হতে পারিনি। তাই জীবনে কিছুই হলো না আর। এমনকি যেসব পত্রিকায় কাজ করেছি গত ৩০ বছর ধরে, এসবের বিভিন্ন রকমের কাজগুলোও সংরক্ষণে নেই।
‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ পত্রিকায় ১৯৯৮ সালে আমার একটি ‘পত্রোপন্যাস’ ধারাবাহিকভাবেই ছাপা হয়েছিল। ‘পত্র-প্রবাহ’। ওই উপন্যাসসহ আরও কত কত লেখা আজ আর আমার কাছে নেই। অকালপ্রয়াত নজরুল গবেষক বুলবুল ইসলামকে নিয়ে কিছু লেখা লিখেছিলাম। ‘সাপ্তাহিক আমোদ ও লাকসামবার্তা’য়। আজকাল আর আমার কাছে এর কিছুই নেই। ইচ্ছে হয় লাকসামবার্তা’র সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া’র সম্মতি নিয়ে একদিন পুরনো লেখা উদ্ধারের অভিযানে যাই। কিন্তু সময় হয় না। জীবন আসলে জীবনেরই মতো। জীবনের জটিল জাল ছিন্ন করা সহজতর নয়।
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া ‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রকাশক। ১৯৯৬ সালে সরকারি ডিক্লারেশন (ঘোষণাপত্র) পাওয়ার পরে ব্রডশিট সাইজে (২৩ ইঞ্চি–১৮ ইঞ্চি আকারে) এই পত্রিকার প্রথম প্রকাশনা শুরু করা হয়। ২০০১ সালে ‘লাকসামবার্তা’ পত্রিকা সরকারি মিডিয়াভুক্ত সংবাদপত্র হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। মিডিয়াভুক্তির আগেই একটি উপজেলা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রের সম্পাদক প্রায় তিন বছর ধরে আমাকে নিয়মিত বেতন দিয়ে গেছেন। মুদ্রণসহ অন্যান্য ব্যয় তো তাঁর ছিলই। জাতীয় পর্যায়ে সরকারিভাবে তথ্য মন্ত্রণালয়ের “সংবাদপত্র প্রচার সংখ্যা নিরীক্ষা প্রত্যয়নপত্র” অনুযায়ী ২০০১ সাল থেকে এখনো (২০২৪) পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রাম ব্যতিত সারাদেশের মফস্বলে ‘লাকসামবার্তা’ সর্বাধিক প্রচারণায় প্রথম স্থান অধিকারী ‘সাপ্তাহিক পত্রিকা’ হিসেবে গণ্য হয়েছে। এটি আসলে কম গৌরবের নয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারী মাসে ‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ নিয়মিত প্রকাশনার ৩০ বছরে পদার্পণ করেছে। সম্পাদকের এই ৩০ বছরের লড়াইয়ে একদা আমিও সংযুক্ত ছিলাম। আমার সাংবাদিকতার পেশাগত বয়সসীমা এ পত্রিকার জন্মের সঙ্গে সংযুক্ত। কারণ ১৯৯৬ সাল থেকে আমিও পেশাগতভাবে সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম।
‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ পত্রিকার সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়ার পরেই যার সর্বোচ্চ অবদান এ পত্রিকায় রয়েছে, তিনি হলেন, পত্রিকাটির সহযোগী সম্পাদক: তোফায়েল আহমেদ। আমাদের তোফায়েল ভাই। এই তোফায়েল ভাইয়ের সঙ্গে আমার কত কত স্মৃতি রয়েছে। একসময়ে পত্রিকার সব কাজ শেষ হলে পরম তৃপ্তিতে একটি পান খেতেন। আজও মনে পড়ে।
সম্পাদক কর্তৃক আজমিরী প্রেস, নিউমার্কেট, চান্দিনা প্লাজা, কুমিল্লা থেকে মুদ্রিত ও ১৩০৭, ব্যাংক রোড, লাকসাম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত এ পত্রিকাটির আরও অনেক স্টাফের নাম এখন ভুলে গেছি। সুমন, জসীম … এমন আরও অনেকে সেই লাকসাম সদর থেকে খাকি খামভর্তি হাতে লেখা সংবাদ এবং বিজ্ঞাপন নিয়ে আসতেন। সেকালে শুধু ফোনই ছিল, যখন আমি এ পত্রিকায় কাজ করছিলাম। মোবাইল এবং ই-মেইল আরও পরে সংযুক্ত হয়েছে।
দেশে থাকলে সম্পাদক মহাশয় প্রায়ই আমাকে হাতে চিঠি লিখতেন। তাঁর হাতের লেখাও ছিল খুবই সুন্দর, স্পষ্ট এবং সেসব আমার সংরক্ষণে এখনো রয়েছে।
আগেই বলেছি ‘লাকসামবার্তা’ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া আকস্মিক সাংবাদিক-সম্পাদক হয়ে যাননি। মাদ্রাসায় সর্বোচ্চ পড়াশোনা করেছেন। তারপর ১৯৮১ সালে কলেজ জীবন শুরু করার পর থেকেই খবর গ্রুপের ‘দৈনিক খবর ও চিত্রাবাংলা’র কুমিল্লা (দ:) জেলা সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ পেয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন। তারপর ১৯৮৪ সালে তিনি ‘দৈনিক সংবাদ’-এর ‘নিজস্ব বার্তা পরিবেশক’ হিসেবে নিয়োজিত হন। অত:পর, ১৯৯২ সাল থেকে ২০২৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত প্রায় ৩২ বছর যাবত শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া ‘দৈনিক ইনকিলাব’ পত্রিকার নিয়োগপ্রাপ্ত ‘বৃহত্তর লাকসাম উপজেলা সংবাদদাতা’ হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এরই পাশাপাশি তিনি নিজের ‘লাকসামবার্তা’ পত্রিকাও সম্পাদনা করা অব্যাহত রেখেছেন।
বৃহত্তর লাকসামের, বর্তমান মনোহরগন্জ উপজেলার ১নং বাইশগাঁও ইউনিয়নের ‘কেয়ারী’ গ্রামে ১৯৬২ সালে শহীদুল্লাহ ভূঁইয়ার জন্ম। তাঁর পিতা মরহুম হাজী আইউব আলী ভূঁইয়ার সঙ্গে জীবনে একবারই আমার দেখা হয়েছিল। তাঁর মায়ের নাম তফুরা খাতুন মণি।
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন নিজ গ্রামের দাদঘর-কেয়ারী ইসলামিয়া মাদ্রাসায়। ১৯৭৪ সালে তিনি ‘দাখিল’ পাস করেন। পরে ঐতিহ্যবাহী দৌলতগঞ্জ গাজীমুড়া আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ‘আলীম’, ও ‘ফাজিল’ এবং ‘ফাজিল স্পেশাল’ (বাংলা ও ইংরেজী-সমমান বিএ) এবং তারপর কামিল (এম.এ) পাশ করেন। মাদ্রাসার পাঠ শেষ করে ঐতিহ্যবাহী নওয়াব ফয়জুন্নেছা কলেজ থেকেও তিনি পুনরায় ‘এইচএসসি’ ও ‘স্নাতক’ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীকালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন শেষে তিনি ‘বাংলাদেশ প্রেস ইনষ্টিটিউট’ থেকে সাংবাদিকতা বিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ লাভ করেন। এ সময়ে তিনি প্রেস ইনষ্টিটিউটের একাধিক কর্মশিবিরেও অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে, ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সংবাদপত্রের রিপোর্টারদের বিভিন্ন বিষয়ে ‘রিপোর্টিং’ ক্ষেত্রে এবং ‘এশিয়ান মাস-কমিউনিকেশন্স এন্ড ইনফরমেশন সেন্টার’ (এম্যিক)-এর উদ্যোগে আয়োজিত তথ্য ও গণযোগাযোগ বিষয়ে তিনি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং অভিজ্ঞানপত্র প্রাপ্ত হন।
সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া ১৯৯১ সালে পবিত্র হজে আকবরি পালন ছাড়াও সার্কভুক্ত দেশসমূহ, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বহু দেশ সফর করেন। বিশেষ করে, তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টধারী (ডুয়েল সিটিজেন) দ্বৈত নাগরিক। বর্তমানে লাকসাম হাউজিং এষ্টেট-এর হোল্ডিং নং ৩৩৯, ব্লক সি (কেয়ারী মিডিয়া হাউজ) এবং মনোহরগন্জ উপজেলার কেয়ারী গ্রামের বাসিন্দা।
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া ৩ ছেলে ও ১ মেয়ে সন্তানের জনক। বড় ছেলে ফয়সাল নাহিয়ান ‘New York Institute of Technology’ (NYIT) থেকে কৃতিত্বের সাথে এম.এ পাস করে বর্তমানে আই.টি ইঞ্জিনিয়ার (বিশেষজ্ঞ) হিসেবে আমেরিকার NORTHEAST POWER COORDINATING COUNCIL, INC-এর Senior Network and Infrastructure Engineer পদে কর্মরত রয়েছেন এবং মেজ ছেলে তারেক আইনান New York “John Jay College of Criminal Justice” থেকে গ্রেজুয়েশন করে নিউইয়র্ক সিটির ল’ এ্যানফোর্সমেন্ট অফিসার (সার্জেন্ট) হিসেবে সুনামের সাথে নিয়োজিত রয়েছেন। ছোট ছেলে শাহেদ আদনান সম্প্রতি নিউইয়র্কের প্রসিদ্ধ কুইন্স কলেজ থেকে গ্রেজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন। আর একমাত্র মেয়ে রাফা ফারজানা নিউইয়র্ক সিটিতে মেধাবী ছাত্রী হিসেবে ইলেভেন গ্রেডে অধ্যয়নরত রয়েছেন বলেই সর্বশেষ জানতে পেরেছিলাম।
শহীদুল্লাহ ভূঁইয়ার স্ত্রীর নাম: জান্নাতুল ফেরদাউস পুষ্প। তিনি ‘লাকসামবার্তা’ পত্রিকার “বিশেষ সংবাদদাতা” হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর ভূমিকাই এ পত্রিকায় সর্বোচ্চ। যদিও তিনি বরাবরই নেপথ্যে রয়েছেন। তাঁর অবদান না থাকলে শহীদুল্লাহ ভূঁইয়ার অগ্রযাত্রার অভিযান অব্যাহত রাখা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। কারণ শুধু স্ত্রীর অপছন্দের কারণেও অনেক দক্ষ সাংবাদিক তাদের জীবন থেকে পত্রিকা বা সাংবাদিকতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। সাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন অসংখ্য দৃষ্টান্তও রয়েছে।
কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলা থেকে প্রকাশিত হলেও এই পত্রিকাটি গত ৩০ বছর ধরে গণমানুষের কথা বলেছে। কোন সড়কে মানুষ চার লেনের সুফল থেকে বঞ্চিত, কোন সড়কে যানজটে নষ্ট হচ্ছে সময় অথবা কখন কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের লাকসাম ও লালমাইয়ের ৮ কিলোমিটার পথ যাত্রীদের গলার কাঁটা হয়েছে, এসব কথা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সময়ে সময়ে বলেছে ‘লাকসামবার্তা’। কোন এলাকায় টানা বৃষ্টিতে শাক-সবজির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, ক্রেতাদের হাত উঠেছে মাথায়, কোন মাসে কুমিল্লায় কতটি খুন এবং ধর্ষণের অভিযোগে কী কী মামলা হয়েছে, কখন যানজট নিরসনে চৌদ্দগ্রাম বাজারের অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিল উপজেলা প্রশাসন অথবা কেন বাংলাদেশী নাগরিকের জন্য অভিবাসী ভিসা দেয়া স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র, কেন খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকদের সুরক্ষা দিতে হবে, কেন দুই উপজেলার রশি টানাটানিতে ৭ বছরেও সংস্কার হয়নি ৫ কিলোমিটারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, কেন চৌদ্দগ্রামে স্কুল মাঠে জলাবদ্ধতা, ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান, কেন মনোহরগঞ্জের হাতিয়ামুড়ী-মেল্লা পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার সড়কের বেহাল দশা, কেন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে ৬ মাসে ১১১ জনের প্রাণহানি … এ রকম শত-সহস্র সংবাদে ছেয়ে আছে বিগত ৩০ বছর ধরে নিয়মিত প্রকাশিত হওয়া এই ‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ পত্রিকাটি। এ অঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লিখতে হলে এই অসামান্য পত্রিকাটিকে অবশ্যই ইতিহাসে সংযুক্ত রাখতে হবে। অন্যথায় ইতিহাসের পূর্ণতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যেতে পারে অথবা অন্যভাবেও বলা যায় যে, ‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ পত্রিকাটি এখন নিজেও একটি ইতিহাস বা ইতিহাসের অংশ।
‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ পত্রিকার সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া সম্পাদক হিসেবে যেমন সফল, তেমনি তিনি একজন সফল পিতাও। অন্যান্য পত্রিকায় সাংবাদিকতা করা ছাড়াও তিনি যেমন নিজের পত্রিকাটিকে গণমুখি সংবাদে পুষ্ট করে বিগত ৩০ বছর ধরে নিয়মিত প্রকাশ করে গেছেন, তেমনি জীবনভর সংগ্রাম করে নিজের সন্তানদেরও সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর ছেলেরা সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ রয়েছেন। কখনো ওই অধ্যায় স্বতন্ত্রভাবে লেখার ইচ্ছে রইলো। শেষ কথা হলো, সন্তান আর সংসারেও সফল হওয়া মানুষ শহীদুল্লাহ ভূঁইয়ার সফলতার নেপথ্যে আজীবন যিনি লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, তিনি তাঁর সহধর্মিনী জান্নাতুল ফেরদাউস পুষ্প। এই পুষ্পই শহীদুল্লাহ ভূঁইয়ার জীবনকে পুষ্পিত হতে সর্বোচ্চ লড়াই সংগ্রাম করেছেন। তাই কোনোদিন ‘সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা’ পত্রিকার ইতিবৃত্ত লিখতে হলে এই অনন্য মানবী ‘জান্নাতুল ফেরদাউস পুষ্প’ এর সমূহ ঋণও স্বীকার করতে হবে।
(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *