বন্ডে বিনিয়োগে মুনাফা কত, ঝুঁকি কোথায়

সঞ্চয়ের অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকের স্থায়ী আমানত (এফডিআর), সঞ্চয়পত্র ও শেয়ারবাজারের পাশাপাশি বন্ডও হতে পারে একটি বিকল্প মাধ্যম। নির্দিষ্ট মেয়াদ ও শর্ত অনুযায়ী মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকায় অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে বন্ড আকর্ষণীয়। তবে বিনিয়োগের আগে মুনাফার হার, কর, মেয়াদ, ঝুঁকি এবং প্রয়োজনে অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ বিবেচনা করা জরুরি।

বন্ড মূলত একধরনের ঋণপত্র। সরকার, ব্যাংক কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অর্থ সংগ্রহের জন্য বন্ড ইস্যু করে। বিনিয়োগকারীরা বন্ড কিনে প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেন। এর বিনিময়ে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী সুদ বা মুনাফা পাওয়া যায়। মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত দেওয়া হয়। তবে শেয়ারের মতো বন্ড কিনলে কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানার অংশ পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশে প্রচলিত বন্ডের মধ্যে রয়েছে সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের করপোরেট বন্ড। করপোরেট বন্ডের মধ্যে প্রচলিত বন্ডের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক সুকুকও রয়েছে। এ ছাড়া জিরো-কুপন ও পারপিচুয়াল বন্ডের মতো বিভিন্ন ধরনের বন্ড বাজারে পাওয়া যায়।

সম্প্রতি ব্র্যাক ব্যাংক এক হাজার কোটি টাকার গ্রিন বন্ড ইস্যু করেছে। দেশের কোনো ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ ধরনের বন্ড ইস্যুর ঘটনা এটিই প্রথম। এ বন্ড থেকে সংগৃহীত অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব ভবন ও শিল্পকারখানায় জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর মতো খাতে বিনিয়োগ করা হবে।

তিন বছরে প্রায় দুই লাখ টাকা মুনাফা

ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রিন বন্ডটি তিন বছর মেয়াদি জিরো-কুপন বন্ড। এ ধরনের বন্ডে নির্দিষ্ট সময় পরপর সুদ দেওয়া হয় না। বরং অভিহিত মূল্যের চেয়ে কম দামে কিনে মেয়াদ শেষে পুরো মূল্য পাওয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগকারী মুনাফা করেন।

বন্ডটির অভিহিত মূল্য ১০ লাখ টাকা হলেও কিনতে বিনিয়োগকারীকে দিতে হবে ৮ লাখ ৪ হাজার ৯৬১ টাকা। তিন বছর পর পাওয়া যাবে ১০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে মুনাফা হবে ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯ টাকা।

তবে এ মুনাফা পেতে বিনিয়োগকারীকে নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এর আগে বন্ড বিক্রি করলে বাজারদরের ওপর ভিত্তি করে প্রকৃত মুনাফা বা লোকসান নির্ধারিত হবে।

কেন বন্ডে বিনিয়োগ করবেন

বন্ডের বড় সুবিধা হলো, অনেক ক্ষেত্রে এর মুনাফার হার, মেয়াদ ও অর্থ পরিশোধের শর্ত আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। ফলে বিনিয়োগকারী মেয়াদ শেষে সম্ভাব্য আয় সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।

কিছু বন্ডে নির্দিষ্ট বিরতিতে সুদ বা মুনাফা পাওয়া যায়। আবার জিরো-কুপন বন্ডে কম দামে কিনে মেয়াদ শেষে অভিহিত মূল্য পাওয়ার মাধ্যমে আয় হয়।

তবে সব বন্ডের ঝুঁকি ও মুনাফার হার এক নয়। সরকারি ট্রেজারি বন্ড, ব্যাংকের বন্ড এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের করপোরেট বন্ডের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বেশি মুনাফার প্রস্তাব দেখেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কারণ, ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি বেশি হলে মুনাফার হারও বেশি হতে পারে।

কর বাদ দিয়ে প্রকৃত আয় হিসাব জরুরি

বন্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর ও অন্যান্য খরচ বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। ঘোষিত মুনাফার হার আকর্ষণীয় হলেও কর ও খরচ বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত আয় কমে যেতে পারে। আবার কর-সুবিধা থাকলে তুলনামূলক কম মুনাফার বন্ড থেকেও ভালো আয় পাওয়া সম্ভব।

ব্র্যাক ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তাদের গ্রিন বন্ডের মুনাফার ওপর অগ্রিম আয়কর প্রযোজ্য হবে না। এ ছাড়া শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পর প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কর রেয়াতের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ব্যাংকটির তথ্য অনুসারে, জরুরি প্রয়োজনে মেয়াদপূর্তির আগেও বাজারে বন্ড বিক্রি করে অর্থ তুলে নেওয়া যাবে। তবে আগাম বিক্রির ক্ষেত্রে বাজারদর ও লেনদেনের শর্ত বিবেচনা করতে হবে।

বন্ডে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে

বন্ডে বিনিয়োগের অর্থ ও মুনাফা নির্ধারিত থাকলেও এটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে প্রতিষ্ঠান বন্ড ইস্যু করেছে, তার ঋণ ও মুনাফা পরিশোধের সক্ষমতা।

সরকারি বন্ডের ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধের দায়িত্ব সরকারের। অন্যদিকে করপোরেট বন্ডে বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা, ঋণ পরিশোধের ইতিহাস ও বন্ডের শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন।

ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রিন বন্ডটি জামানতহীন। তাই এ বন্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া বাজারে সুদের হার বেড়ে গেলে আগে ইস্যু করা নির্দিষ্ট মুনাফার বন্ডের বাজারমূল্য কমতে পারে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বিক্রি করলে লোকসানের আশঙ্কাও থাকে।

কোথা থেকে কিনবেন বন্ড

ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের মাধ্যমে ট্রেজারি বন্ড কেনার সুযোগ রয়েছে। তবে সব ব্যাংক ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের মাধ্যমে এসব বন্ড কেনা যায়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে হিসাব খুলতে হয়।

অন্যদিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বন্ড কিনতে বিনিয়োগকারীর বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব থাকতে হবে।

সব মিলিয়ে বন্ডে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু মুনাফার হার দে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *