
দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা কাটিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির প্রক্রিয়া আবারও শুরু হয়েছে। তবে আদালতের রায়ের পরও প্রশাসনিক কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা থাকায় কবে নাগাদ পদোন্নতির আদেশ জারি হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা হাজারো শিক্ষকের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে প্রধান শিক্ষকের ৩৬ হাজার ২৩৫টি পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা বা গ্রেডেশন প্রস্তুত ও যাচাইয়ের কাজ চলছে।
জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরিতে গুরুত্ব
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসীর তথ্য অনুযায়ী, আদালতের রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর পদোন্নতি-সংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। বর্তমানে শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরি করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘদিন পদোন্নতি বন্ধ থাকায় শিক্ষকদের চাকরির নথি, সার্ভিস বুক, বদলির তথ্যসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করতে হচ্ছে। যোগ্য কোনো শিক্ষক যেন ভুল তথ্যের কারণে পদোন্নতির তালিকা থেকে বাদ না পড়েন, সে জন্য মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে পদোন্নতির আদেশ দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে তালিকা প্রস্তুত ও যাচাইয়ের কাজ শেষ করে ঠিক কবে পদোন্নতির আদেশ জারি করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি।
আদালতের রায়ে নির্ধারিত হবে জ্যেষ্ঠতা
প্রাথমিক শিক্ষকদের পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি বিরোধের অন্যতম বিষয় ছিল জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ। ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি দেশের ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। ওই সময় প্রণীত বিধিমালায় জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের আগের চাকরির মেয়াদের ৫০ শতাংশ কার্যকর চাকরিকাল হিসেবে গণনার বিধান রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি সরাসরি নিয়োগ পাওয়া সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় তাঁদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শর্তও ছিল।
এই বিধানের বিরুদ্ধে জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট করা হয়। হাইকোর্ট সরকারের বিধানের একটি শর্ত বাতিল করলেও পরে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বাতিল করে সরকারের বিধিমালার পক্ষে রায় দেন।
রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরাসরি নিয়োগ পাওয়া সরকারি শিক্ষকেরা জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অগ্রাধিকার পাবেন। আর ২০১৩ সালে বা তার পরে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের সঙ্গে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের আগের চাকরির ৫০ শতাংশ কার্যকর চাকরিকাল বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এই নিয়ম অনুসরণ করে জেলাভিত্তিক জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে।
দ্রুত পদোন্নতি চান শিক্ষকরা
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর পদোন্নতির কার্যক্রম শুরু হলেও প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষকরা। তাঁদের অভিযোগ, বছরের পর বছর আইনি জটিলতায় পদোন্নতি আটকে থাকায় তাঁরা পদমর্যাদার পাশাপাশি আর্থিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন।
ঢাকার এক সহকারী শিক্ষক দ্রুত পদোন্নতির দাবি জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ সময় মামলা ও আইনি প্রক্রিয়ায় কেটে গেছে। আদালতের রায়ের পরও প্রয়োজনীয় নথি পেতে দেরি হওয়ায় পদোন্নতির কার্যক্রম এগোয়নি। এখন আর নতুন কোনো প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি না করে দ্রুত জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ ও পদোন্নতির আদেশ দেওয়ার দাবি তাঁদের।
অবসরের কাছাকাছি থাকা শিক্ষকদের উদ্বেগ আরও বেশি। তাঁদের আশঙ্কা, জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রস্তুত ও যাচাইয়ে আবার দীর্ঘ সময় লাগলে অনেকেই চাকরিজীবনে পদোন্নতির সুযোগ না পেয়েই অবসরে যেতে পারেন।
নতুন নিয়োগের পথও তৈরি হবে
দেশে বর্তমানে ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অর্ধেকের বেশি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়েছে। শূন্য পদগুলোতে পদোন্নতি কার্যকর হলে বিদ্যালয়গুলোর এ সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে পদোন্নতির কারণে সহকারী শিক্ষকের পদেও নতুন শূন্যতা তৈরি হবে। হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যমান শূন্য পদের পাশাপাশি পদোন্নতিজনিত শূন্যতা মিলিয়ে প্রায় ৩৮ হাজার ৪৩৩টি সহকারী শিক্ষকের পদ খালি হতে পারে।
সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া ১৪ হাজার ৩৮৪ জন নতুন সহকারী শিক্ষক ওরিয়েন্টেশন শেষে বিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। তবে পদোন্নতি কার্যক্রম চূড়ান্ত হলে সৃষ্ট শূন্য পদ পূরণে নতুন নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে আইনি বাধা কাটার পর প্রাথমিক শিক্ষকদের পদোন্নতি নিয়ে নতুন করে আশা তৈরি হয়েছে। এখন শিক্ষকদের অপেক্ষা জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত হওয়া এবং পদোন্নতির আদেশ জারির। তবে সেই অপেক্ষার অবসান কবে হবে, তা নির্ভর করছে চলমান প্রশাসনিক কার্যক্রম কত দ্রুত শেষ হয় তার ওপর।