সংসদ সদস্য থেকে পুলিশের রিমান্ডে: দুই মাসে গাজী নজরুলকে ঘিরে একের পর এক ঘটনা

মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে পাল্টে গেছে ঘটনাপ্রবাহ। ব্যক্তিগত একটি ভিডিও প্রকাশ থেকে শুরু করে দলীয় বহিষ্কার, সংসদ সদস্য পদ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গ্রেপ্তার—সব মিলিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন এই সংসদ সদস্য।

সর্বশেষ মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে মরিয়মকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। মামলায় গাজী নজরুলকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

শুরুটা ব্যক্তিগত ভিডিও ঘিরে

জুলাইয়ের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুলের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এতে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। শুরুতে তাঁর দলের অনেক নেতা-কর্মী ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেন।

পরে গাজী নজরুল নিজেই জানান, ভিডিওতে থাকা তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মরিয়মকে বিয়ে করেছিলেন তিনি।

দল থেকে বহিষ্কার

ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক তদন্ত শুরু করে। ২২ জুলাই দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দলীয় তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হয়েছে বলে জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পরে সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনকেও বিষয়টি জানানো হয়।

তবে দল থেকে বহিষ্কারের পরও তাঁর সংসদ সদস্য পদ তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল হয়নি। গাজী নজরুল নিজেও জানিয়েছিলেন, দলীয় সদস্যপদ না থাকলেও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল আছেন। এ নিয়ে সংসদের বিভিন্ন কার্যক্রমেও তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

এরপর সামনে আসে মরিয়মের মৃত্যু

ঘটনার মোড় আরও ঘুরে যায় ২০ সেপ্টেম্বর। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ পরে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। ওই মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়।

এজাহারে মরিয়মের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বিয়ের পর তাঁকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মুঠোফোনে এসব বিষয়ে মরিয়ম কথা বলতেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এগুলো মামলার বাদীপক্ষের অভিযোগ, যার সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল?

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০ সেপ্টেম্বর বেলা আনুমানিক ৩টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে কোনো একসময় মরিয়মের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত বাসায় আসতে বলেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরে তাঁর বাবা সেখানে গিয়ে মেয়েকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পুলিশের উপস্থিতিতে দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি কথিত আত্মহত্যার নোটও উদ্ধার করা হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

তবে ওই নোটটি মরিয়মের নিজের লেখা কি না, তা এখনো ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।

দুই মাসে বদলে গেল রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বাস্তবতা

গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা-৪ আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তৃতীয়বারের মতো সংসদে আসেন তিনি।

কিন্তু সংসদে আসার কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনকে ঘিরে একের পর এক ঘটনা সামনে আসে। জুনে দ্বিতীয় বিয়ে, জুলাইয়ে সেই সম্পর্কের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও প্রকাশ, এরপর দলীয় তদন্ত ও বহিষ্কার—সবশেষে সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যু এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা।

বর্তমানে মামলাটির তদন্ত চলছে। ফলে মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, কথিত নির্যাতনের অভিযোগ এবং ঘটনাটির সঙ্গে কারও অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *