বিশ্ববাজারে কমল তেলের দাম, ব্রেন্ট ১০১ ডলারে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও কমেছে জ্বালানি তেলের দাম। সৌদি আরব থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির দিকে বিনিয়োগকারীদের নজর থাকায় সোমবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমে আসে।

আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বরের ফিউচার দর ২ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৬৮ ডলারে নেমেছে। এর কয়েক দিন আগে, ১৫ সেপ্টেম্বর, ব্রেন্টের দাম ১০৯ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের অক্টোবরের ফিউচার দর ২ দশমিক ১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ১৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

সরবরাহ নিয়ে স্বস্তি, তবে উদ্বেগ কাটেনি

ইরান-সমর্থিত হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরও সৌদি আরব থেকে তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাকে বাজারে দাম কমার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষকেরা ১৮ সেপ্টেম্বরের এক নোটে জানান, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে পরিবহন বিঘ্নিত হলেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তেল সরবরাহ হচ্ছে। তাঁদের হিসাবে, গত ১০ দিনে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৭১ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হয়েছে। তবে ২০২৫ সালের গড়ের তুলনায় এই সরবরাহ দৈনিক ৬১ লাখ ব্যারেল কম।

তবে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি দূর হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নিয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়লে তেলের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

স্কাই লিংকস ক্যাপিটাল গ্রুপের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ড্যানিয়েল তাকিয়েদ্দিনের মতে, তেলের দাম অনেকটাই নির্ভর করবে রপ্তানি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক অগ্রগতি কতটা হয় তার ওপর। পরিস্থিতির অবনতি হলে কিংবা জাহাজ চলাচলে নতুন করে বিঘ্ন ঘটলে সরবরাহ কমে গিয়ে তেলের দাম আবারও বাড়তে পারে।

১০০ ডলারের ওপরে ব্রেন্ট

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবার ১০০ ডলার ছাড়ায়। এরপর থেকে দাম ওঠানামা করলেও এখনো ১০০ ডলারের নিচে নামেনি।

১৫ সেপ্টেম্বর ব্রেন্টের দাম সর্বোচ্চ ১০৯ ডলারে উঠেছিল। পরদিনই তা কমে প্রায় ১০৪ ডলারে নেমে আসে। এরপর সোমবার আরও কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৬৮ ডলারে ঠেকেছে।

যুদ্ধের ধাক্কায় দাম উঠেছিল ১২৬ ডলারে

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করার পর আন্তর্জাতিক তেলবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। ১ মার্চ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রায় ৭২ ডলার। পরে ৩০ এপ্রিল তা বেড়ে সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে পৌঁছায়।

পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিরতি শুরু হলে তেলের দাম কমে ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। তবে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয় তেলের দাম।

কমছে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও তেলের দাম প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়াকে দেখা হচ্ছে।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিস্টাডের হিসাব অনুযায়ী, পেট্রোকেমিক্যাল ও পরিবহন খাতে তেলের ব্যবহার কমে যাওয়ায় চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বিশ্বে দৈনিক তেলের চাহিদা ৩৫ লাখ ব্যারেল কমেছে।

এই হ্রাসের অর্ধেকেরও বেশি এসেছে চীন থেকে। দেশটিতে পরিবহন খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক রাসায়নিক শিল্পের সম্প্রসারণের কারণে তেলনির্ভর জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যালের চাহিদাও কমছে।

ফলে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া—এই দুই বিপরীতমুখী প্রবণতার মধ্যেই ওঠানামা করছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *