গণপরিবহনে ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করা আবশ্যক

              ড. মাহবুবুল হাসান\ বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকার নিয়ে তুলনামূলক অনেক বেশি আলোচনা হয়। কোনো দোকানে বেশি দাম নিলে, মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য বিক্রি হলে বা ভেজাল পণ্য পাওয়া গেলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালায়।

              ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়, ভোক্তারা অভিযোগও করতে পারেন। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত একটি সেবা- গণপরিবহনের ক্ষেত্রে যেন ভোক্তা অধিকার বলে কিছুই নেই।

              অথচ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, পরিবহন একটি সেবা। অর্থের বিনিময়ে যে ব্যক্তি এই সেবা গ্রহণ করেন, তিনিই ভোক্তা।

              ফলে একজন বাস, ট্রেন, ট্যাক্সি ক্যাব, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা মেট্রো রেলের যাত্রী শুধু যাত্রী নন, তিনি আইনের দৃষ্টিতে একজন ভোক্তাও। তাঁর নিরাপদ, মানসম্মত, নির্ধারিত মূল্য ও সময় অনুযায়ী সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই অধিকার কার্যত অদৃশ্য।

              ঢাকার বাসে প্রতিদিন লাখো মানুষ এমন সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যা অন্য কোনো সেবা খাতে কল্পনাও করা যায় না।

অতিরিক্ত সিট বসিয়ে যাত্রীকে অস্বস্তিকর পরিবেশে বসতে বাধ্য করা, নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ভাঙা জানালা, অকার্যকর ফ্যান, নির্ধারিত সময় না মানা, মাঝপথে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা, স্টপেজের আগেই যাত্রী নামিয়ে দেয়া, চালকের বেপরোয়া আচরণ, যাত্রীর সঙ্গে অশোভন আচরণ কিংবা ফিটনেসবিহীন বাস- সবই যেন দৈনন্দিন বাস্তবতা। অথচ এসবের কোনোটিকেই ভোক্তা অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয় না।

              একটি রেস্তোরাঁয় অপরিষ্কার পরিবেশ থাকলে যদি ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর অভিযান চালাতে পারে, তাহলে প্রতিদিন হাজারো মানুষ বহনকারী নোংরা বাসগুলোর বিরুদ্ধে কেন একই ব্যবস্থা নেয়া হবে না? কোনো দোকান ওজনে কম দিলে জরিমানা হয়, কিন্তু একজন যাত্রী নির্ধারিত সেবা না পেলে তার প্রতিকার কোথায়?

              সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, গণপরিবহনে ভোক্তার অভিযোগ জানানোর কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। একজন যাত্রী যদি বাসের অতিরিক্ত ভাড়া, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নির্ধারিত রুট ভঙ্গ, চালকের অসদাচরণ কিংবা সময়সূচি লঙ্ঘনের অভিযোগ করতে চান, তাহলে তিনি কোথায় যাবেন? বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ, পরিবহন মালিক সমিতি, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর- দায়িত্ব যেন সবার, আবার কারো নয়। ফলে যাত্রীরা অভিযোগ করতে নিরুৎসাহ হন।

              এদিকে পরিবহন খাতের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোও অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তার স্বার্থের বিপরীতে গেছে। গত দুই দশকে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা প্রায় আড়াই গুণ বাড়লেও বাণিজ্যিক সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা কার্যত অপরিবর্তিত রয়েছে। ট্যাক্সি ক্যাব খাতে এমন কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে যে নতুন বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বাস নামানোর ক্ষেত্রেও দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা ও রুট পারমিটের জট নতুন উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহ করছে। ফলে গণপরিবহনের বিকল্প কমেছে, প্রতিযোগিতা কমেছে, আর ভোক্তা হয়েছে সবচেয়ে অসহায়।

              এটি পরিবহনসংকটের পাশাপাশি একটি ভোক্তা অধিকার সংকটও। কারণ যখন একটি শহরের ৮০ শতাংশ মানুষ গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল, তখন সেই সেবার মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। একজন যাত্রী শুধু গন্তব্যে পৌঁছতে চান না, তিনি নিরাপদ, সম্মানজনক ও নির্ধারিত মানের সেবা প্রত্যাশা করেন। এই প্রত্যাশা বিলাসিতা নয়, আইনগত অধিকার।

              বিশ্বের উন্নত শহরগুলোতে গণপরিবহনকে শুধু যানবাহন হিসেবে নয়, একটি জনসেবা হিসেবে দেখা হয়। সময়সূচি লঙ্ঘন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, চালকের অসদাচরণ কিংবা অতিরিক্ত ভিড়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সহজ ডিজিটাল ব্যবস্থা থাকে। অভিযোগের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়। অনেক দেশে যাত্রী সন্তুষ্টি সূচক প্রকাশ করা হয় এবং সেই সূচকের ভিত্তিতে অপারেটরদের মূল্যায়ন করা হয়। বাংলাদেশেও এখন এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।

              সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন খাতে ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিয়েছে। এখন সময় এসেছে গণপরিবহনকেও সেই কাঠামোর আওতায় আনার। প্রতিটি বাস, ট্রেন, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মেট্রো রেলে দৃশ্যমান স্থানে অভিযোগ নম্বর ও কিউআর কোড প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিআরটিএ ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে একটি সমন্বিত অভিযোগ ব্যবস্থাপনা চালু করা প্রয়োজন। নিয়মিত ভোক্তা অধিকার অভিযান চালিয়ে বাসের পরিচ্ছন্নতা, অতিরিক্ত আসন, নির্ধারিত ভাড়া, ফিটনেস ও যাত্রীসেবার মানও তদারকি করা উচিত। শুধু কাগজপত্র নয়, যাত্রীসেবার মানকেও লাইসেন্স নবায়নের অন্যতম শর্ত করতে হবে।

              বাসের মতো রেলের যাত্রীদেরও নিরাপদ, সময়মতো, মানসম্মত ও প্রতিশ্রæত সেবা পাওয়ার আইনগত অধিকার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে রেলের যাত্রীদের ক্ষেত্রেও এই অধিকার নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা প্রায় অনুপস্থিত। নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ট্রেন চললেও, কোচের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী বহন করলেও, শৌচাগার বা কোচের পরিচ্ছন্নতা ন্যূনতম মানে না থাকলেও যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর সহজ ও কার্যকর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। বাস্তবতা হলো, অভিযোগ দিয়েও কোনো কাজ না হওয়ায় যাত্রীরা এখন আর সে পথে হাঁটেনই না। অনেক সময় টিকিট থাকা সত্তে¡ও নির্ধারিত আসন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়, কোচ পরিবর্তন করা হয় বা অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে ভোগান্তি বাড়ে। এসবকে সেবার ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা না করে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা ভোক্তা অধিকারের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

              গণপরিবহনে ভোক্তা অধিকার প্রশ্নটি শুধু বাস বা রেলের পাশাপাশি লঞ্চ, ফেরি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ট্যাক্সি ক্যাব, মেট্রো রেল এবং ভবিষ্যতের বিআরটি- সব ধরনের গণপরিবহনের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। একজন যাত্রী যে মাধ্যমেই ভ্রমণ করুন না কেন, ভাড়া পরিশোধের মাধ্যমে তিনি একজন ভোক্তায় পরিণত হন। ফলে নিরাপদ, নির্ধারিত সময়ের, পরিচ্ছন্ন ও মানসম্মত সেবা পাওয়ার অধিকার তাঁর আইনগত অধিকার।

              বাস্তবে দেখা যায়, প্রতিটি পরিবহনব্যবস্থারই আলাদা সমস্যা থাকলেও ভুক্তভোগী সব ক্ষেত্রেই যাত্রীরাই। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় মিটারে যেতে অস্বীকৃতি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা গন্তব্য বেছে যাত্রী নেয়া দীর্ঘদিনের সমস্যা। লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি, ঘাট ব্যবস্থাপনার বিশৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি এখনো উদ্বেগজনক। ফেরিঘাটে দীর্ঘ অপেক্ষা, শৃঙ্খলার অভাব এবং যানবাহনের অগ্রাধিকার নিয়েও নিয়মিত অভিযোগ রয়েছে। মেট্রো রেল তুলনামূলক আধুনিক সেবা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে স্টেশনে অতিরিক্ত ভিড়, যান্ত্রিক ত্রুটি, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং সেবার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থাৎ পরিবহনভেদে সমস্যার ধরন ভিন্ন হলেও ভোক্তার অধিকার লঙ্ঘনের চিত্র প্রায় একই।

              দুঃখজনক হলো, গণপরিবহনের কোনো ক্ষেত্রেই ভোক্তাকেন্দ্রিক সেবা মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। একজন যাত্রী কোথায় অভিযোগ করবেন, কত দিনের মধ্যে তাঁর অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান কিভাবে জবাবদিহি করবে কিংবা সেবার মান খারাপ হলে কী প্রতিকার মিলবে- এসব বিষয়ে কার্যকর ও সমন্বিত কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে পরিবহন খাতে জবাবদিহির পরিবর্তে দায় এড়ানোর প্রবণতাই বেশি দেখা যায়।

              আধুনিক নগর ব্যবস্থায় গণপরিবহনকে শুধু যানবাহন হিসেবে নয়, একটি নাগরিক সেবা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশেও সময় এসেছে সব ধরনের গণপরিবহনের জন্য একটি অভিন্ন ‘যাত্রী বা ভোক্তা অধিকার সনদ’ প্রণয়ন করার। সেখানে সেবার ন্যূনতম মান, সময়ানুবর্তিতা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, ভাড়া, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা এবং ক্ষতিপূরণের নীতিমালা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কারণ গণপরিবহনের উন্নয়ন শুধু নতুন সড়ক, সেতু বা যানবাহন কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রকৃত মানদন্ড হলো ভোক্তা হিসেবে যাত্রী কতটা সম্মানজনক ও নির্ভরযোগ্য সেবা পাচ্ছেন।

              গণপরিবহনে ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত নীতিগত সংস্কার। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর আওতায় পরিবহনসেবাকে কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে শুধু বাজার, রেস্তোরাঁ বা পণ্যের মান তদারকির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস, রেল, লঞ্চ, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ট্যাক্সি ক্যাব ও মেট্রো রেলের সেবার মান পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দায়িত্বও দিতে হবে।

সব ধরনের গণপরিবহনের জন্য একটি ‘জাতীয় যাত্রী অধিকার সনদ’ প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এতে যাত্রী কী ধরনের সেবা পাবেন, কতটুকু বিলম্ব গ্রহণযোগ্য, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, নির্ধারিত ভাড়া, প্রতিবন্ধীবান্ধব সুবিধা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ থাকতে হবে। ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক দেশে ট্রেন বা বিমানের ক্ষেত্রে যাত্রী অধিকার আইনি সুরক্ষা পেয়েছে; বাংলাদেশেও গণপরিবহনের জন্য এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

একটি সমন্বিত ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। যাত্রী যেন একটি হটলাইন, মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বাস, রেল, লঞ্চ, মেট্রো রেল কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে সহজেই অভিযোগ জানাতে পারেন। প্রতিটি যানবাহন ও স্টেশনে অভিযোগের কিউআর কোড, হটলাইন নম্বর এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা উচিত। অভিযোগের অগ্রগতি অনলাইনে অনুসরণ করার সুযোগও থাকতে হবে। গণপরিবহন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়নে শুধু আর্থিক বা কারিগরি বিষয় নয়, ‘যাত্রী সন্তুষ্টি সূচক’ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। সময়ানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, সেবার মান ও অভিযোগ নিষ্পত্তির হারকে লাইসেন্স নবায়ন এবং পরিচালনার অনুমতির সঙ্গে যুক্ত করলে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বাড়বে।

              গণপরিবহনকে শুধু যানবাহন বা ব্যবসা হিসেবে নয়, একটি মৌলিক নাগরিক সেবা হিসেবে দেখতে হবে। নতুন বাস, ট্রেন বা মেট্রো রেল নির্মাণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোতে ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করা। একজন নাগরিক যখন ভাড়া পরিশোধ করেন, তখন তিনি শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ কেনেন না; তিনি নিরাপদ, সময়নিষ্ঠ, সম্মানজনক ও মানসম্মত একটি সেবার মূল্য পরিশোধ করেন। সেই সেবা নিশ্চিত করতে পারলেই বাংলাদেশের গণপরিবহনব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব ও আধুনিক হয়ে উঠবে।

              লেখকঃ গবেষক, বাংলাদেশ হিস্ট্রি অ্যান্ড আর্কিওলজি রিসার্চ সোসাইটি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *