জমি জবরদখলকারীদের বিরুদ্ধে এবার কঠোর ব্যবস্থা- ভূমিমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি

              বাসস\ দেশের নানা প্রান্তে জমি নিয়ে বিরোধ, জবরদখল, সীমানা নিয়ে সংঘাত এবং প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের ভোগান্তির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারো জমি দখলে থাকার অভিযোগ, কারো জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ, আবার কোথাও কাগজপত্র থাকার পরও দখল ফিরে না পাওয়ার অভিযোগ— ভূমি নিয়ে এমন বাস্তবতায় এবার কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেল সরকার।

              সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু বলেছেন, দেশের স্বার্থে জমি দখলদারদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি জানান, এ বিষয়ে সরকার আন্তরিকতা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

              তবে ভূমিমন্ত্রীর এই বক্তব্যে ভূমি দখল ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হলেও মূলত: এখন বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে যে, ঘোষণার পর বাস্তবে কতটা দ্রæত নড়বে প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা!

              মূলত: দখলের অভিযোগ থেকে প্রতিকার- এটি দীর্ঘ পথ। অর্থাৎ জমি দখলের অভিযোগ উঠলেই বিষয়টি সরলভাবে নিষ্পত্তি করা যায় না। প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণে দলিল, খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ, মৌজা ম্যাপ, দখলের প্রকৃতি ও সীমানাসহ সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের প্রয়োজন হয়ে থাকে।

              কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এসব প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে বিরোধ আরও জটিল হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে জমি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ, স্থানীয় উত্তেজনা কিংবা সংঘাতের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। এই জায়গাতেই সরকারের ঘোষণার বাস্তব গুরুত্ব। দখলদারিত্বের অভিযোগ যেন বছরের পর বছর ফাইলের মধ্যে আটকে না থাকে- এটাই এখন মানুষের প্রত্যাশা।

              ‘প্রভাব’ নয়, প্রমাণই হোক শেষ কথা! সত্যিকার অর্থে ভূমি বিরোধের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত প্রমাণ। কে প্রভাবশালী, কে সাধারণ মানুষ- তা নয়; কার দাবি আইন ও নথিপত্রে প্রতিষ্ঠিত, সেটিই নির্ধারণের বিষয়।

              কোনো ব্যক্তি অন্যের জমি দখল করে থাকলে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। আবার অভিযোগকারী ভুল হলে- সেটিও আইনসম্মতভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। কারণ ভূমি বিরোধে একতরফা সিদ্ধান্ত যেমন অন্যায় তৈরি করতে পারে, তেমনি দীর্ঘসূত্রতাও নতুন বিরোধের জন্ম দিতে পারে। তাই সরকারের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি প্রয়োজন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রæত ভূমি-তদন্ত ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম।

              এছাড়া, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও আলোচনায় উঠে এসেছে। সংসদে বক্তব্য দেয়ার সময় ভূমিমন্ত্রী পূর্ববর্তী সরকারের আমলে ‘দরবেশ বাবা’, ‘ভূমি বাবা’সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বৈরতান্ত্রিক চর্চার কথা উল্লেখ করেন এবং অভিযোগ করেন যে- তারা বিভিন্নভাবে দেশকে শোষণ করেছেন।

              তবে এসব রাজনৈতিক বক্তব্যের নির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভরশীল। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হওয়াই হবে আইনের শাসনের মূল ভিত্তি।

              এ সংক্রান্তে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন- জমি ফেরত পেতে আর কত অপেক্ষা? কারণ ভূমি নিয়ে বিরোধে সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকেন অনেক সাধারণ মানুষ। নিজের জমির দাবি নিয়ে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে হয়, কখনো স্থানীয় বিরোধ মেটাতে সালিশে যেতে হয়, আবার কখনো আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। বছরের পর বছর হয়রানির শেষ থাকেনা। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যেই কেউ কেউ জমির ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হন। কোথাও জমি নিয়ে নতুন স্থাপনা তৈরি হয়, কোথাও সীমানা পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে, আবার কোথাও দীর্ঘদিনের দখলকে কেন্দ্র করে বিরোধ আরও কঠিন হয়ে যায়। এ কারণেই ভূমিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর মানুষের প্রত্যাশা- অভিযোগ গ্রহণ থেকে তদন্তÍ, তদন্ত থেকে সিদ্ধান্ত এবং সিদ্ধান্ত থেকে বাস্তব প্রতিকার- প্রতিটি ধাপেই যেন জবাবদিহি থাকে।

              আর দখলদারিত্ব বন্ধে শুধু ঘোষণা নয়, দরকার দৃশ্যমান ব্যবস্থাও। তদানুযায়ী জমি দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- অভিযোগের দ্রæত যাচাই, সরকারি রেকর্ডের নির্ভুলতা, সঠিকভাবে সীমানা নির্ধারণ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং আইন অনুযায়ী দ্রæত প্রতিকার। একই সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধে কোনো পক্ষ যাতে নিজ হাতে আইন তুলে না নেয়, হুমকি বা সংঘাতে না জড়ায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি জমির বিরোধ কখনো কখনো শুধু জমির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পরিবার, প্রতিবেশী ও স্থানীয় সমাজের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন তৈরি করতে পারে। তাই এখন বাস্তবায়নের পালা!

              আসলে সংসদে ভূমিমন্ত্রীর কঠোর বক্তব্য নিঃসন্দেহে ভূমি দখল ও অনিয়মের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কিন্তু মানুষের আস্থা তৈরি হবে তখনই, যখন তারা মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাবেন।

              যার জমি বৈধভাবে তার- তার অধিকার নিশ্চিত হবে। যার দাবি সত্য নয়- আইন অনুযায়ী সেটিও স্পষ্ট হবে। আর যে-ই অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে দখলে রাখুক, পরিচয় বা প্রভাবের বাইরে গিয়ে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে- এটাই এখন প্রত্যাশা। অত:পর, ভূমিমন্ত্রীর ঘোষণা তাই এখন শুধু একটি বক্তব্য নয়; সামনে এটি সরকারের জন্য এক বড় বাস্তব পরীক্ষাই বটে। অর্থাৎ জমি দখলের অভিযোগে ভুক্তভোগী মানুষের কাছে রাষ্ট্র কত দ্রæত, কতটা নিরপেক্ষ এবং কতটা কার্যকর প্রতিকার পৌঁছে দিতে পারে- সেটাই। কারণ ভূমির অধিকার শুধু সম্পত্তির প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিকের আইনগত অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের একটা বড় প্রশ্নই বটে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *