
বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত মেলাটির উদ্বোধন করবেন দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মনজুরুল ইসলাম। আয়োজকদের মতে, স্থানীয়ভাবে ‘বাসিয়াহাট মেলা’ নামেও পরিচিত এই আয়োজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।
আয়োজক সমিতির সভাপতি শীতল মার্ডী জানান, প্রতিবছর শারদীয় দুর্গাপূজার এক বা দুই দিন পর মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চলে আসা এ আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায়। মেলার দিন সকাল থেকেই গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ও আশপাশের এলাকায় মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে।
জীবনসঙ্গী খোঁজার ঐতিহ্য
বউ মেলার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো পছন্দের জীবনসঙ্গী খোঁজার সুযোগ। দূরদূরান্ত থেকে আসা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেক অবিবাহিত তরুণ-তরুণী এ মেলায় নিজেদের পছন্দের মানুষকে খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
কারও সঙ্গে পরিচয় ও পছন্দ তৈরি হলে বিষয়টি পরে পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়। উভয় পরিবারের সম্মতি থাকলে পরবর্তী সময়ে পারিবারিকভাবে বিয়ের আয়োজন করা হয়।
বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী উন্নয়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক কমলা কান্ত হাসদা বলেন, মেলায় কাউকে পছন্দ করলেই তাৎক্ষণিকভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয় না। বরং এটি পরিচিত হওয়া, পরস্পরকে বোঝা এবং ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গী নির্বাচনের একটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক পরিসর।
দিনাজপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ এ মেলায় অংশ নেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতি মেলার বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করে।
লোকজ উৎসব, কেনাকাটা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন
জীবনসঙ্গী খোঁজার পাশাপাশি বউ মেলা পরিণত হয় বড় ধরনের লোকজ উৎসবে। তরুণ-তরুণীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে বন্ধু কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মেলায় আসেন। মাঠজুড়ে বসে বিভিন্ন পণ্যের দোকান।
মেলায় মিষ্টি, ফুচকা, জিলাপি, পিঠা, প্রসাধনী, গৃহস্থালির সামগ্রী ও মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান এবং ঢোল-মন্দিরাসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনা মেলার আনন্দকে বাড়িয়ে তোলে।
স্থানীয় আদিবাসী নেতা ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হাবিব লাকড়া জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ মেলা স্থানীয় মানুষের সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে রয়েছে। সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাপন ও যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবর্তন এলেও মেলাটির প্রতি আকর্ষণ কমেনি।
নিরাপত্তায় থাকবে পুলিশ ও আনসার
মেলা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। বীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, মেলা শুরু থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত পুলিশ, আনসারসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন।
বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমা খাতুনও জানিয়েছেন, ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে।
আধুনিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিচিত হওয়ার সুযোগ বাড়লেও বীরগঞ্জের এই বউ মেলা ধরে রেখেছে নিজস্ব ঐতিহ্য। কারও কাছে এটি জীবনসঙ্গী খোঁজার সুযোগ, আবার কারও কাছে শিকড়, সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার এক বিশেষ উৎসব।