
দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকের সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। অনুমোদিত ৪১ হাজার ৮০৬টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৩০ হাজার ৩১১ জন। ফলে সরকারি স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসকের ১১ হাজার ৪৯৫টি পদ শূন্য রয়েছে।
সোমবার জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেনের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ তথ্য জানান। মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে প্রশ্নের উত্তর দেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
সংসদে দেওয়া তথ্যে বলা হয়, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এক গবেষণার হিসাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যূনতম মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রায় ৮৮ হাজার ৯০৯ জন চিকিৎসক প্রয়োজন।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান শূন্য পদগুলো ধাপে ধাপে পূরণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। জনগণের জন্য সহজলভ্য, মানসম্মত ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই এসব কার্যক্রমের লক্ষ্য বলে উল্লেখ করা হয়।
পরিবার পরিকল্পনায় ওষুধ ও সামগ্রীর ঘাটতি
সংসদে প্রশ্নোত্তরে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম নিয়েও তথ্য তুলে ধরা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, গত তিন বছর ধরে চাহিদার তুলনায় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ কিছুটা কম থাকায় মাঠপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও চিকিৎসা উপকরণের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং ক্রয়প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত মাঠপর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করার কাজ চলছে।
আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এসব সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।
সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আসন
মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. জাহান্দার আলী মিয়ার প্রশ্নের জবাবে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজে মোট আসন রয়েছে ৫ হাজার ১০০টি। অন্যদিকে ৬৮টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আসনসংখ্যা ৬ হাজার ২৭৮টি।
হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে সংসদে কারণ তুলে ধরা
সংসদে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিমুজ্জামানের প্রশ্নের লিখিত জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশে হামের টিকা সংগ্রহে বিলম্ব এবং পরবর্তী সময়ে টিকার সংকট তৈরির পেছনে প্রশাসনিক নীতির পরিবর্তন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ইউনিসেফের সতর্কতা যথাযথভাবে বিবেচনায় না নেওয়ার বিষয়গুলো ভূমিকা রেখেছে।
লিখিত জবাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে একটি পরিপূরক হাম-রুবেলা বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি বাতিল হওয়ায় নিয়মিত টিকাদানের আওতা কমে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের শিশুদের পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতেও হামের প্রাদুর্ভাব গুরুতর আকার ধারণ করে।
চলতি অর্থবছরে জাকাত সংগ্রহ ৭ কোটি টাকা
সংসদে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৭ কোটি টাকা জাকাত সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা সরকারি জাকাত ফান্ডে জমা রয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের জাকাত ফান্ডে রয়েছে।
ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন (কায়কোবাদ) জানান, ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা, ধর্মীয় বিষয়ে বিভ্রান্তি দূর করা এবং সামাজিক সংঘাত প্রতিরোধে দেশের বিভিন্ন মত ও পথের আলেম-ওলামাদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।
উপজেলাভিত্তিক গবেষণা ও ইফতা কার্যক্রম বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রয়োজন অনুযায়ী একটি জাতীয় ওলামা পরামর্শক কমিটি গঠনের বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করবে বলে সংসদে জানানো হয়।
৩৫ বছরে নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৪ হাজার ৫২ জনের
সংসদে নৌযান ও নৌ দুর্ঘটনা সম্পর্কেও উল্লেখযোগ্য তথ্য দেওয়া হয়েছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, দেশে প্রথমবার পরিচালিত নৌযান শুমারিতে মোট ২ লাখ ৫২ হাজার ৮১৩টি নৌযান তালিকাভুক্ত হয়েছে।
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, গত ৩৫ বছরে ৪৭ হাজার ৬০৬টি নৌযানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ হাজার ৬৭১টি মামলা মেরিন কোর্টে বিচার শেষে নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে ৯ হাজার ৯৩৫টি মামলা বিচারাধীন।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে বিভিন্ন নৌ দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৫২ জন নিহত এবং ৮০৭ জন আহত হয়েছেন।
সংসদে উপস্থাপিত এসব তথ্য দেশের স্বাস্থ্য ও নৌপরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে বিদ্যমান জনবল ঘাটতি, সেবাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছে।