
কুড়িগ্রামে সারের সংকট ঘিরে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। রৌমারীতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর সার না পেয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা এক ডিলারের গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সার নিয়ে গেছেন। একই দিনে ভূরুঙ্গামারীতে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকেরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকেও কিছু সময় অবরুদ্ধ থাকতে হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকালে রৌমারীর বন্দবেড় বাজারে মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের গুদামে প্রথম ঘটনাটি ঘটে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, সার নেওয়ার জন্য তাঁরা রোববার রাত প্রায় দুইটা থেকেই গুদামের সামনে এসে অবস্থান নেন। রাত পেরিয়ে সকাল হলেও সার বিতরণ শুরু না হওয়ায় অপেক্ষমাণ কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে কয়েকজন কৃষক গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে সেখান থেকে সার বের করে নিয়ে যেতে দেখা যায় তাঁদের।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে কয়েকজনকে গুদাম থেকে সার বের করে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। কেউ মাথায় করে, আবার কেউ ভ্যানযোগে সার নিয়ে যাচ্ছেন।
মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলামের দাবি, গুদামে প্রায় ৭৫০ বস্তা সার মজুত ছিল। সকালে প্রায় এক হাজার কৃষক সেখানে জড়ো হন। কে আগে সার নেবেন, তা নিয়ে ধাক্কাধাক্কির একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য তাঁরা থানায় ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান। এই সুযোগে কিছু কৃষক গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ বস্তা সার নিয়ে যান।
পরে পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় গুদামে থাকা সার বিতরণ শুরু করা হয়। হিসাব-নিকাশ শেষ হলে ঠিক কত বস্তা সার নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানান ডিলারের ব্যবস্থাপক।
রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাওসার আলী বলেন, সার বিতরণের সময় পুলিশকে আগে থেকে জানানো হয়নি। কৃষকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েক বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
তবে গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম বসুনিয়া। তাঁর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি ভুয়া এবং বন্দবেড় ইউনিয়নে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রৌমারী উপজেলায় প্রায় ৪২ হাজার কৃষক রয়েছেন এবং তাঁরা নিয়ম অনুযায়ী সার পাচ্ছেন।
ভূরুঙ্গামারীতে সড়ক অবরোধ, কৃষি কর্মকর্তা অবরুদ্ধ
রৌমারীর ঘটনার পাশাপাশি একই দিন ভূরুঙ্গামারীতেও সারের দাবিতে উত্তেজনা তৈরি হয়। উপজেলার সোনাহাট এলাকায় সার বিতরণ শুরু হলে চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগ করেন কৃষকেরা।
একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেন। খবর পেয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গেলে তাঁকেও কিছু সময় অবরুদ্ধ করে রাখেন বিক্ষোভকারীরা। পরে পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আজিম উদ্দিন বলেন, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় প্রতিদিনই সার নিয়ে কৃষকদের বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে। কোথাও কোথাও সড়কও অবরোধ করা হচ্ছে। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে নিয়মিত মাঠে যেতে হচ্ছে।
ওসি আরও বলেন, কৃষি বিভাগে কী পরিমাণ সার মজুত রয়েছে এবং কৃষকদের প্রকৃত চাহিদা কত—এ বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য জানানো হলে সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব। কৃষি বিভাগ পর্যাপ্ত সার থাকার কথা বললেও কৃষকেরা সার না পেয়ে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করছেন।
জেলায় পর্যাপ্ত সার থাকার দাবি
জেলায় পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে বলে দাবি করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন। তাঁর মতে, আগাম ভুট্টা ও বেগুন চাষের জন্য অনেক কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় বাড়তি সার সংগ্রহ করে রাখছেন। ফলে কিছু এলাকায় সাময়িক চাপ তৈরি হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তা জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয় করে সার বিতরণের চেষ্টা চলছে।
এর আগে রোববার নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা বাজারে সার বিতরণে দেরির অভিযোগে একটি পরিবেশকের গুদামে ভাঙচুর করেন ক্ষুব্ধ কৃষকেরা। একই দিন ভূরুঙ্গামারীতেও সারের দাবিতে সড়কে বিক্ষোভ হয়। লালমনিরহাটেও একই দাবিতে সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে।
এরও আগে ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নের ধলডাঙ্গা বাজারে এক ডিলারের গুদামের বেড়া ভেঙে ২২৫ বস্তা সার নিয়ে যান কৃষকেরা। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে ১১৫ বস্তা সার ফেরত দেওয়া হয়।
ওই ঘটনায় ডিলার মেসার্স শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে সময়মতো সার না দেওয়া এবং ক্যাশমেমোতে অসংগতির অভিযোগ ওঠে। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
পরপর এসব ঘটনায় কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সার বিতরণব্যবস্থা, মজুত ও কৃষকদের চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।