ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই: অনিশ্চয়তায় লাখো শিক্ষিত তরুণ

উচ্চশিক্ষার সনদ হাতে নিয়েও কাঙ্ক্ষিত চাকরি মিলছে না। বছরের পর বছর নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি, আবেদন আর সাক্ষাৎকারের অপেক্ষায় কাটছে হাজারো তরুণের সময়। ফলে জীবনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময়টি পার হচ্ছে অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক চাপে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা সব শিক্ষাগত স্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার গ্র্যাজুয়েট চাকরির বাইরে রয়েছেন। বিপরীতে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা ব্যক্তিদের বেকারত্বের হার মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ

শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সাত লাখ নতুন গ্র্যাজুয়েট বের হলেও আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে প্রায় তিন লাখ মানুষের জন্য। ফলে প্রতিবছরই নতুন করে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা।

রাজধানীর বিভিন্ন মেসে থাকা চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের অধিকাংশের বড় উদ্বেগ এখন চাকরি নয়, মাস শেষে মেসভাড়া, খাবার ও পরীক্ষার আবেদন ফি জোগাড় করা। অনেকে পরিবার থেকে অর্থ নিয়ে চললেও দীর্ঘদিন চাকরি না পাওয়ায় মানসিক চাপ বাড়ছে।

চাকরির দীর্ঘ নিয়োগপ্রক্রিয়াও বেকারত্বের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে আবেদন থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত প্রায় তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যায়। এ সময়ের মধ্যে অনেক প্রার্থী বয়স, অভিজ্ঞতা কিংবা আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বেসরকারি খাতেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মবাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অমিল রয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপরিবেশে শুধু সনদ নয়, বাস্তব দক্ষতার গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। তাই কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, ভাষা ও পেশাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

তাঁদের মতে, শুধু সরকারি চাকরির অপেক্ষায় বছরের পর বছর সময় নষ্ট না করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ, পার্টটাইম কাজ, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা স্কিলভিত্তিক প্রকল্পে যুক্ত হওয়া উচিত। এতে অভিজ্ঞতা বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দক্ষতার ঘাটতির কারণে দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এতে ব্যক্তি পর্যায়ের ক্ষতির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও সম্ভাব্য উৎপাদনশীলতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত করা, শিল্পখাত সম্প্রসারণ, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন কর্মহীন থেকে দেশের উন্নয়ন সম্ভাবনাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বদেশ রেস্তোরাঁ এন্ড পাটি সেন্টার