ব্যবহার নেই প্রায়; তবু গুনতে হচ্ছে মাসিক বিল

ফোন অচল, বিল সচল, লাকসামে বিটিসিএলের পুরোনো ল্যান্ডফোন ঘিরে গ্রাহকের ভোগান্তি, কার্যালয়ের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন

একসময় যোগাযোগের অপরিহার্য মাধ্যম ছিল টিএন্ডটি ফোন। অফিস-আদালত, ব্যাংক, শিল্প-কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এমনকি অনেক বাসাবাড়িতেও টেলিফোন সংযোগ থাকা ছিল স্বাভাবিক বিষয়। টেলিফোনের রিং বাজলেই কর্মব্যস্ত হয়ে উঠত অফিস। জরুরি যোগাযোগ থেকে শুরু করে দূর-দূরান্তের মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা—সবকিছুর অন্যতম ভরসা ছিল এই তারযুক্ত ফোন।

সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। মুঠোফোন ও ইন্টারনেটনির্ভর যোগাযোগ এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। ফলে একসময়কার অপরিহার্য ল্যান্ডফোন অনেক প্রতিষ্ঠানেই পরিণত হয়েছে প্রায় অব্যবহৃত এক সংযোগে।

কিন্তু ফোন ব্যবহার না হলেও বিল থেমে নেই।

কুমিল্লার লাকসামে এমন পুরোনো বিটিসিএল সংযোগের সংখ্যা কত, কতগুলো বাস্তবে ব্যবহার হচ্ছে এবং কতগুলো কেবল কাগজে-কলমে সক্রিয়—তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র সহজে পাওয়া যায় না। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, ব্যবহার প্রায় না থাকলেও সংযোগ চালু থাকলে মাসিক বিলের দায় থেকে যাচ্ছে।

এদিকে লাকসামে বিটিসিএলের স্থানীয় কার্যালয়ের কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। সরেজমিনে কার্যালয় এলাকায় কর্মীদের উপস্থিতি সীমিত থাকার পাশাপাশি ভবন ও আঙিনার ব্যবহার নিয়েও দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।

চার দশক ধরে সংযোগ, এখন ব্যবহার নেই

লাকসাম থেকে প্রকাশিত সরকারি মিডিয়াভুক্ত সাপ্তাহিক লাকসামবার্তা পত্রিকা কার্যালয়ে প্রায় চার দশক ধরে একটি বিটিসিএল টেলিফোন সংযোগ চালু রয়েছে।

একসময় পত্রিকা কার্যালয়ের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল এই ফোন। কিন্তু বর্তমানে অফিসের অধিকাংশ যোগাযোগ সম্পন্ন হয় মুঠোফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে। ফলে পুরোনো ল্যান্ডফোনটির ব্যবহার এখন প্রায় নেই বললেই চলে।

তারপরও সংযোগটি চালু থাকায় নিয়মিত মাসিক বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পত্রিকাটির প্রকাশক ও সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া।

তিনি বলেন, অফিসের যোগাযোগব্যবস্থা এখন মূলত মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটনির্ভর। ফলে বিটিসিএলের ফোনটি কার্যত ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু সংযোগ চালু থাকায় নিয়মিত বিল দিতে হচ্ছে।

তার অভিযোগ, কখনো সংযোগে সমস্যা দেখা দিলে সেটি ঠিক করানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এতে সময় ও শ্রম ব্যয় হয়। প্রয়োজনের সময় দ্রুত সেবা পাওয়াও সবসময় সহজ হয় না।

‘ব্যবহার নেই, তবু বিল দিতে হচ্ছে’

শহীদুল্লাহ ভূঁইয়ার বক্তব্যে উঠে আসে পুরোনো সংযোগ ব্যবস্থার আরেকটি বাস্তবতা। ব্যবহার না থাকার পরও সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করলে মাসিক বিলের দায় গ্রাহকের ওপর থেকেই যায়।

অর্থাৎ, গ্রাহকের সামনে দুটি পথ—ব্যবহার না করেও বিল পরিশোধ করা, অথবা সংযোগ বন্ধের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করা।

দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যবহার না করা সংযোগ কেন চালু রাখছে, সেটি একদিকে যেমন গ্রাহকের সিদ্ধান্তের বিষয়; অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সেবা প্রতিষ্ঠানের কাছেও এটি সংযোগ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।

প্রশ্ন উঠছে—কত সংযোগ আসলে ব্যবহৃত হচ্ছে?

লাকসামের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পুরোনো কার্যালয়ে এখনো বিটিসিএল ল্যান্ডফোনের সংযোগ রয়েছে। তবে এসব সংযোগের কতগুলো নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কতগুলো দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত—তার একটি হালনাগাদ তালিকা জনসমক্ষে রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

যদি কোনো সংযোগ বছরের পর বছর ব্যবহার না হয়, তাহলে সেটি সক্রিয় রাখার প্রয়োজনীয়তা কী—এ প্রশ্নের পাশাপাশি গ্রাহকের অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের বিষয়টিও সামনে আসে।

অন্যদিকে সংযোগ বিচ্ছিন্নের প্রক্রিয়া যদি জটিল বা সময়সাপেক্ষ হয়, তাহলে অনেক গ্রাহক পুরোনো সংযোগটি বন্ধ না করে বিল পরিশোধ করেই যেতে পারেন।

সরেজমিনে বিটিসিএল কার্যালয়ে যা দেখা গেল

গ্রাহকের ফোনসেবা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি লাকসামের বিটিসিএল কার্যালয়ের কার্যক্রম নিয়েও দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।

লাকসাম বাইপাসসংলগ্ন চৌদ্দগ্রাম রোডের উত্তর পাশে অবস্থিত বিটিসিএল কার্যালয় ভবনটি সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়।

ভবনের সামনে একটি সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে—‘সংরক্ষিত এলাকা, বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ।’

তবে সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞার ওই সাইনবোর্ড থাকা সত্ত্বেও ভবনের আঙিনা ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন ব্যক্তির আড্ডা রয়েছে। ভবনের গেটের ভেতরেও লোকজনের অবস্থান দেখা যায়।

প্রতিবেদন তৈরির সময় কার্যালয় এলাকায় সংশ্লিষ্ট স্টাফদের মধ্যে লাইনম্যান আনু মিয়াকে ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতি চোখে পড়েনি বলে প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণে আসে।

এ অবস্থায় সরকারি সম্পত্তির নিরাপত্তা, কার্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম এবং কর্মীদের উপস্থিতি—তিনটি বিষয় নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কোটি টাকা মূল্যের ভবন, ব্যবহারের চিত্র কী?

বিটিসিএলের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ও অবকাঠামো জনসম্পদের অংশ। এসব স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা এবং নিয়মিত কার্যক্রমের আওতায় থাকার কথা।

কিন্তু কোনো কার্যালয় নিয়মিতভাবে তালাবদ্ধ থাকলে কিংবা সেখানে স্বাভাবিক দাপ্তরিক কার্যক্রম দৃশ্যমান না হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—স্থাপনাটির ব্যবহার কতটা কার্যকর?

আর যদি একই সঙ্গে ওই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগসেবা পরিচালনার দায়িত্বও থাকে, তাহলে জনবল উপস্থিতি ও সেবা প্রদানের বাস্তব চিত্র আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সেবা নিতে গ্রাহক, কিন্তু সেবাকেন্দ্রে কতটা কার্যক্রম?

বিটিসিএলের টেলিফোন সেবা নিতে বা সংযোগ-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হয়। তথ্য ও সেবার জন্য ১৬৪০২ নম্বরে যোগাযোগের ব্যবস্থাও রয়েছে।

কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন হচ্ছে—কার্যালয় পর্যায়ে যদি নিয়মিত জনবল উপস্থিতি ও কার্যক্রম নিশ্চিত না থাকে, তাহলে গ্রাহক কীভাবে দ্রুত সেবা পাবেন?

একদিকে সংযোগের সমস্যা হলে গ্রাহককে অফিসে যোগাযোগ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সেই কার্যালয়ের কার্যক্রম নিয়ে যদি প্রশ্ন থাকে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

ল্যান্ডফোন কি অপ্রয়োজনীয়?

না—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।

পুলিশ স্টেশন, উপজেলা প্রশাসন, হাসপাতাল, ব্যাংক, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্থায়ী অফিসিয়াল যোগাযোগ নম্বর এখনো প্রয়োজনীয় হতে পারে। জরুরি পরিস্থিতিতে একটি নির্দিষ্ট ও স্থায়ী যোগাযোগ নম্বরের গুরুত্ব রয়েছে।

সমস্যাটি মূলত সেখানে, যেখানে সংযোগটি দীর্ঘদিন ব্যবহারই হচ্ছে না।

যে সংযোগের প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে সেবা সচল রাখা জরুরি। আর যে সংযোগ বছরের পর বছর ব্যবহার হচ্ছে না, সেটি গ্রাহককে সহজ প্রক্রিয়ায় সাময়িকভাবে স্থগিত বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার সুযোগ দেওয়াও প্রয়োজন।

দায় কার—গ্রাহকের, নাকি ব্যবস্থাপনার?

অব্যবহৃত সংযোগ চালু রাখার সিদ্ধান্ত একদিকে গ্রাহকের। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারহীন সংযোগ শনাক্ত করা এবং গ্রাহককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া সেবা ব্যবস্থাপনার অংশও হতে পারে।

একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনায় নিয়মিতভাবে জানা দরকার—

  • কোন সংযোগ সক্রিয়;
  • কোন সংযোগ নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে;
  • কোন সংযোগ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার হচ্ছে না;
  • কোথায় কারিগরি ত্রুটি রয়েছে;
  • কোন সংযোগ বন্ধ করতে গ্রাহক আবেদন করেছেন;
  • এবং কতগুলো সংযোগ থেকে নিয়মিত বিল আদায় হলেও বাস্তবে সেবা ব্যবহারের পরিমাণ খুবই কম।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংযোগ ব্যবস্থাপনা করা হলে একদিকে গ্রাহকের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমতে পারে, অন্যদিকে বিটিসিএলের নিজস্ব সম্পদ ও সেবা ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হতে পারে।

লাকসামবার্তার অভিজ্ঞতা কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা?

লাকসামবার্তা কার্যালয়ের পুরোনো বিটিসিএল সংযোগের অভিজ্ঞতা একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রশ্নগুলো বৃহত্তর।

মুঠোফোন ও ইন্টারনেটের যুগে এখনো কত পুরোনো ল্যান্ডফোন সংযোগ চালু আছে? সেগুলোর কতগুলো নিয়মিত ব্যবহার হয়? কতগুলো শুধু বিল তৈরির তালিকায় সক্রিয়? আর কতগুলো সংযোগ কারিগরি ত্রুটির কারণে কার্যত অচল?

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে লাকসামে বিটিসিএলের বর্তমান ল্যান্ডফোন সেবার বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।

পুরোনো সেবা, নতুন বাস্তবতা

একসময় টিএন্ডটি ফোন ছিল অফিসের প্রাণ। এখন সেই ফোন অনেক জায়গায় নীরব পড়ে থাকে। প্রযুক্তির পরিবর্তনে যোগাযোগব্যবস্থা এগিয়েছে, কিন্তু পুরোনো সংযোগ ব্যবস্থাপনার অনেক প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।

লাকসামবার্তা কার্যালয়ের অভিজ্ঞতা সেই প্রশ্নগুলোকেই সামনে এনেছে—ব্যবহার নেই, কিন্তু বিল আছে; সমস্যা হলে সেবা পেতে ভোগান্তি আছে; আর একই সময়ে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের কার্যক্রম নিয়েও স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন রয়েছে।

তাই এখন প্রয়োজন পুরোনো সংযোগগুলো নিয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক পর্যালোচনা। কোথায় ল্যান্ডফোন প্রয়োজন, কোথায় প্রয়োজন নেই, কোন সংযোগ সচল, কোনটি অচল এবং গ্রাহক কীভাবে সহজে অপ্রয়োজনীয় সংযোগ বন্ধ করতে পারবেন—এসব বিষয়ে কার্যকর ও গ্রাহকবান্ধব ব্যবস্থা নেওয়া হলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান হতে পারে।

কারণ যোগাযোগ প্রযুক্তি বদলে গেলেও একটি বিষয় বদলানো জরুরি—সেবা না থাকলে শুধু বিল নয়, সেবার কার্যকারিতারও হিসাব থাকতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *