বয়স বাড়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব ধরে রাখা কঠিন হয় কেন

শৈশবে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে আলাদা কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় না। একই স্কুলে পড়া, একই মাঠে খেলতে যাওয়া কিংবা একই পাড়ায় বসবাস—এসব স্বাভাবিক কারণেই প্রতিদিন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। ফলে সম্পর্ক তৈরি হয় সহজেই, সময় দেওয়ার হিসাবও করতে হয় না।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে বদলে যায় জীবনের ব্যস্ততা। কেউ চাকরির কারণে অন্য শহরে চলে যান, কেউ ব্যবসা বা পেশাগত কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কারও জীবনে আসে বিয়ে, সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব। একসময় যে বন্ধুর সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন দেখা হতো, তার সঙ্গেই বছরে এক-দুবার দেখা হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

মজার বিষয় হলো, অনেক সময় এই দূরত্বের পেছনে কোনো ঝগড়া বা মনোমালিন্য থাকে না। জীবনযাত্রার পরিবর্তনই ধীরে ধীরে দুজন মানুষকে আলাদা করে দেয়।

বন্ধুত্ব তৈরি করতে দরকার সময়

যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জেফরি হলের একটি গবেষণায় বন্ধুত্ব তৈরিতে সময়ের গুরুত্ব উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, পরিচিত সম্পর্ক থেকে সাধারণ বন্ধুত্বে যেতে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ ঘণ্টা একসঙ্গে সময় কাটানোর প্রয়োজন হতে পারে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে প্রয়োজন আরও বেশি সময়—প্রায় ৮০ থেকে ১০০ ঘণ্টা। সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে ২০০ ঘণ্টার বেশি সময়ও লাগতে পারে।

প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে এই সময় বের করাটাই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ। কাজ, পরিবার, সন্তান, ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও নানা সামাজিক ব্যস্ততার মধ্যে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাটানোর সুযোগ কমে যায়।

শৈশবের মতো সহজ থাকে না সম্পর্ক

শিশুদের বন্ধুত্ব সাধারণত অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত। সেখানে কে কতটা সফল, কার পেশা কী কিংবা সামাজিক অবস্থান কেমন—এসব বিষয় খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না।

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনে নানা ধরনের প্রত্যাশা ও দায়িত্ব যুক্ত হয়। একজন হয়তো অফিসের কাজে ব্যস্ত, অন্যজন সন্তান বা পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনায় ব্যস্ত। ফলে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আগের মতো স্বাভাবিকভাবে দেখা হওয়ার সুযোগ থাকে না।

তখন বন্ধুত্ব বজায় রাখতে ইচ্ছাকৃতভাবে সময় বের করতে হয়। অথচ ব্যস্ত জীবনে সেটিই সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়।

সব দূরত্বের কারণ ঝগড়া নয়

বন্ধুত্বে দূরত্ব তৈরি হলেই ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে সম্পর্কের মধ্যে কোনো বড় সমস্যা হয়েছে। জীবনের পরিস্থিতিগত পরিবর্তনও এর বড় কারণ হতে পারে।

চাকরি পরিবর্তন, নতুন শহরে চলে যাওয়া, বিয়ে, সন্তান জন্ম, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা জীবনযাপনের পরিবর্তনের কারণে অনেক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ কমে যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে দুজনের জীবনযাত্রা ও অগ্রাধিকার বদলে যাওয়ায় সম্পর্কটিও আগের অবস্থায় থাকে না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে?

বর্তমানে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা আগের চেয়ে সহজ। একটি মেসেজ, ফোনকল, জন্মদিনের শুভেচ্ছা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মন্তব্যের মাধ্যমেই যোগাযোগ করা যায়।

তবে অনলাইনে যোগাযোগ থাকা আর গভীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় থাকা এক বিষয় নয়। নিয়মিত কথা বলা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরের আপডেট দেখা বন্ধুত্বের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু সরাসরি সময় দেওয়া ও ব্যক্তিগতভাবে পাশে থাকার বিকল্প সবসময় তৈরি করে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে একাকিত্বের বিস্তারের বিষয়টিও উঠে এসেছে। অর্থাৎ যোগাযোগের প্রযুক্তি বাড়লেও মানুষের ব্যক্তিগত সংযোগের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়নি।

বন্ধুর সংখ্যা নয়, সম্পর্কের মান গুরুত্বপূর্ণ

একসঙ্গে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় থাকা মানেই গভীর বন্ধুত্ব নয়। গবেষণাগুলোতে সামাজিক সম্পর্কের গুণগত মান এবং মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার মধ্যে সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।

২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের ৩৮টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে বন্ধুত্বের মান ও একসঙ্গে সময় কাটানোর সঙ্গে মানুষের সুস্থতার সম্পর্ক পাওয়া যায়।

এমনকি বন্ধুর সংখ্যা অনেক না হলেও একজন ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

বন্ধুত্ব ধরে রাখতে কী করা যায়?

বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সবসময় বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত ছোট ছোট উদ্যোগই অনেক সময় সম্পর্ককে সক্রিয় রাখতে পারে।

মাসে একবার দেখা করার পরিকল্পনা, মাঝেমধ্যে ফোন করা, ব্যস্ত বন্ধুর খোঁজ নেওয়া কিংবা সুযোগ পেলে একসঙ্গে কিছু সময় কাটানো—এসব অভ্যাস পুরোনো সম্পর্ককে ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভালো বন্ধুত্বও সবসময় নিজে থেকে টিকে থাকবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা। জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও কোনো সম্পর্ককে গুরুত্ব দিলে তার জন্য কিছুটা সময় আলাদা করতেই হয়।

তবে সব বন্ধুত্ব আজীবন একইভাবে টিকে থাকবে, এমনটাও নয়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু মানুষ দীর্ঘদিন পাশে থাকেন, আবার কারও সঙ্গে পথ কিছুদূর যাওয়ার পরই আলাদা হয়ে যায়। সম্পর্কের এই পরিবর্তন স্বাভাবিক।

একসময় যে বন্ধু প্রতিদিনের জীবনের অংশ ছিলেন, তিনি হয়তো আজ অনেক দূরে। তবু জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর উপস্থিতির মূল্য কমে যায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *