ইউপি ভোটের সময়সূচি নিয়ে ইসি-সরকারের সমন্বয়হীনতা প্রকাশ্যে

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইসি সোমবার সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাব্য তারিখ জানালেও পরদিন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দাবি করেন, এ বিষয়ে সরকার বা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।

অন্যদিকে ইসি বলছে, ঘোষিত সময়সূচি চূড়ান্ত নয়; এটি প্রাথমিক পরিকল্পনা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে ১৭ সেপ্টেম্বর বৈঠকের পর নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে।

সাত ধাপে সম্ভাব্য ভোটের পরিকল্পনা

ইসি যে প্রাথমিক পরিকল্পনা জানিয়েছে, তাতে প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপ ২৭ মে আয়োজনের কথা বলা হয়েছে।

তবে এসব তারিখ এখনো চূড়ান্ত নয়। ইসি জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

‘সরকার কিছুই জানে না’: প্রতিমন্ত্রী

মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে আগে থেকে জানানো হয়নি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে ইসির সঙ্গে সরকারের কোনো চিঠি আদান-প্রদান বা অন্য কোনো মাধ্যমে আলোচনা হয়নি। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমেই তাঁরা বিষয়টি জানতে পেরেছেন।

তবে প্রতিমন্ত্রী একই সঙ্গে ইসির স্বাধীনতা ও নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক ক্ষমতার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা, বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা হয়।

ইসির বক্তব্য, সময়সূচি এখনো প্রাথমিক

সরকারের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে—এটি নিশ্চিত। তবে কবে, কী পদ্ধতিতে এবং কোন পর্যায়ে নির্বাচন হবে, সে বিষয়ে কমিশনে প্রাথমিক আলোচনা চলছে।

তিনি জানান, দুই দিন ধরে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে এবং এর ধারাবাহিকতায় সোমবার সম্ভাব্য সময়সূচি প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এটি একেবারেই প্রাথমিক। ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠকের পর বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে গিয়ে ইসি সচিব বলেন, তাঁর বক্তব্যকে তিনি সম্মান করেন এবং এ নিয়ে পাল্টা মন্তব্য করতে চান না।

কয়েকটি সম্ভাব্য তারিখ নিয়েও প্রশ্ন

ইসির প্রাথমিক তালিকায় ৩০ ডিসেম্বরকে একটি ভোটের সম্ভাব্য দিন রাখা হয়েছে। ওই দিন বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী হওয়ায় দিনটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ১৩ ডিসেম্বর জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার গণিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিনে ভোট আয়োজন করা হলে প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে আসতে পারে।

স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে আইনি এখতিয়ার

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ আইনে নির্বাচন কমিশনকে চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচন আয়োজন, পরিচালনা ও সম্পাদনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ভোট গ্রহণের তারিখ, সময় ও স্থানসহ নির্বাচন পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়ে বিধান করার ক্ষমতাও কমিশনের রয়েছে।

এ কারণে ইসি মনে করছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রকাশ করা তাদের এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ে। তবে সময়সূচি চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি এখন আলোচনায় এসেছে।

১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের দিকে নজর

সরকার ও ইসির বক্তব্যে পার্থক্য দেখা দেওয়ার পর এখন ১৭ সেপ্টেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওই বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত ও প্রস্তুতির বিষয়গুলো আলোচনায় আসার কথা রয়েছে।

এর পরই ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি অপরিবর্তিত থাকবে, নাকি তারিখ ও ধাপে পরিবর্তন আসবে—সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *