
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের কাচারীপাড়া এলাকায় তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে একের পর এক বসতবাড়ি ও কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। গত ছয় দিনের ভাঙনে অন্তত আটটি পরিবারের শেষ সম্বল হারিয়ে গেছে। আরও শতাধিক পরিবার এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পুরো গ্রামই নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তার তীব্র স্রোতে নদীতীরের বিশাল অংশ ধসে পড়ছে। কোথাও বাড়ির উঠান নদীতে মিলিয়ে গেছে, কোথাও ঘরের বারান্দা ঝুলছে নদীর ওপর। অনেকে ঘরের টিন, কাঠ ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। আবার অনেক পরিবার গৃহস্থালির মালামাল নিয়ে খোলা আকাশের নিচে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত সুলতানা বেগম জানান, গত ৩৫ বছরের সংসারজীবনে অন্তত ১০ বার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন তিনি। প্রায় এক দশক আগে নতুন করে বসতি গড়লেও এবার সেই আশ্রয়ও তিস্তার গর্ভে চলে গেছে। তাঁর দাবি, জীবনের সব সঞ্চয় ও স্বপ্ন নদীর পানিতে হারিয়ে গেছে, এখন কোথায় যাবেন তা ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
একই এলাকার বাসিন্দা মোতালেব মিয়া জানান, ২০০৮ সালে প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত তাঁর নয় কক্ষের পাকা বাড়িটিও নদীতে বিলীন হয়েছে। শেষ বয়সে আবারও ভিটেমাটি হারিয়ে তিনি গভীর হতাশা প্রকাশ করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সম্প্রতি নদীর পানি কমতে শুরু করলেও ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। বর্তমানে পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও প্রবল স্রোতের কারণে নদীতীর দ্রুত ধসে পড়ছে। ইতোমধ্যে একাধিক পরিবারের বসতবাড়ি, পুকুর ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমি নদীগর্ভে চলে গেছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী নদীশাসনের অভাবে প্রতিবছরই ভাঙনের শিকার হচ্ছেন তাঁরা। অনেক পরিবার জমিজমা, ঘরবাড়ি ও সারা জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আরও অনেক বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হবে।
নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী বলেন, ভাঙনের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইতোমধ্যে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাঁদের জন্য জরুরি সহায়তা হিসেবে শুকনো খাবার দেওয়া হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বসতবাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকশ জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।