মুঠোফোনের যুগে হারিয়ে যাচ্ছে টিএন্ডটি ফোন, তবুও বিলের বোঝা

একসময় একটি টিএন্ডটি ফোনের সংযোগ পাওয়া ছিল অনেকটা কাঙ্ক্ষিত বিষয়। বাড়িতে কিংবা অফিসে টেলিফোন থাকলে দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেত সহজেই। সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অনেক বাসাবাড়িতেও ছিল ল্যান্ডফোনের ব্যবহার। জরুরি যোগাযোগ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজন—সবকিছুতেই তারযুক্ত এই ফোনের ওপর নির্ভর করতে হতো মানুষকে। কিন্তু সময় বদলেছে। মানুষের হাতে হাতে এখন মুঠোফোন, আর ইন্টারনেটের কল ও বার্তা যোগাযোগকে করেছে আরও সহজ। ফলে একসময়কার অপরিহার্য টিএন্ডটি বা ল্যান্ডফোন এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে ব্যবহারের তালিকা থেকে।

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে ল্যান্ডফোনের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বিভাগ গঠিত হয়। ১৯৭৫ সালে তা টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বোর্ডে এবং ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ডে রূপ নেয়। পরে ২০০৮ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ড—বিটিটিবি—বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড বা বিটিসিএলে রূপান্তরিত হয়।

একসময় জেলা শহর থেকে উপজেলা পর্যন্ত টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও কার্যালয়কে ঘিরে ছিল ব্যস্ততা। একটি ফোন কলের জন্য মানুষকে অপেক্ষা করতে হতো, অনেক ক্ষেত্রে সংযোগ পেতে নানা ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। এরপর মোবাইল ফোনের বিস্তার সেই ব্যবস্থাকে দ্রুত বদলে দেয়। এখন একটি মুঠোফোন দিয়েই দেশের যেকোনো প্রান্তে মুহূর্তে যোগাযোগ করা যায়। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের কল যুক্ত হওয়ার পর যোগাযোগের ধরন আরও বদলে গেছে।

এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে লাকসামেও। একসময় লাকসামের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে টিএন্ডটি ফোন ছিল যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। এখন অনেক অফিসেই মুঠোফোন, ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম প্রধান হয়ে উঠেছে। ফলে পুরোনো ল্যান্ডফোনের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমেছে। কোথাও ফোন ব্যবহার হয় খুব কম, আবার কোথাও সংযোগ থাকলেও সেটি কার্যত পড়ে থাকে।

লাকসামের এই চিত্র অবশ্য শুধু লাকসামের নয়। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। একসময় যে ল্যান্ডফোন ছাড়া অফিসের যোগাযোগ কল্পনা করা কঠিন ছিল, সেই ফোন এখন অনেক প্রতিষ্ঠানে পুরোনো আসবাবের মতো পড়ে আছে। ফোন সেট আছে, সংযোগও আছে, কিন্তু নিয়মিত ব্যবহার নেই। অথচ সংযোগ চালু থাকলে গ্রাহকের ওপর বিলের দায় থেকে যায়।

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ব্যবহার না করা একটি ল্যান্ডফোনের সংযোগ কেন ধরে রাখা হবে?

বিটিসিএল এখনো ল্যান্ডফোন সেবা চালু রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে ল্যান্ড টেলিফোনকে বাড়ি ও অফিসে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করে নতুন সংযোগের জন্য নিকটস্থ বিটিসিএল অফিসে যোগাযোগ এবং অনলাইনে আবেদনের সুযোগের কথা বলা হয়েছে। সমস্যা বা তথ্যের জন্য ১৬৪০২ নম্বরে যোগাযোগের ব্যবস্থাও রয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তির পরিবর্তন হলেও সেবাটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চালু রয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, গ্রাহকের প্রয়োজনের সঙ্গে সেবাটির ব্যবহার কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেই প্রশ্ন দিন দিন বড় হচ্ছে। অনেক গ্রাহক বছরের পর বছর ল্যান্ডফোন ব্যবহার করেন না। কেউ মোবাইল ফোনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল, কেউ আবার অফিস পরিবর্তন করেছেন, কেউ সংযোগটি ভুলেই গেছেন। কিন্তু যথাযথভাবে সংযোগ বাতিল না করলে বিলের বিষয়টি থেকে যায়। ফলে ব্যবহার না করেও কোনো কোনো গ্রাহককে নিয়মিত অর্থ গুনতে হয়।

অন্যদিকে বিটিসিএলের জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পুরোনো ল্যান্ডফোন অবকাঠামো, এক্সচেঞ্জ ও সেবাকেন্দ্রগুলোকে শুধু অতীতের স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখার পরিবর্তে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। বিটিসিএলের বর্তমান কার্যক্রমেও আধুনিক টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ও ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

লাকসামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকদের প্রশ্ন তাই শুধু ল্যান্ডফোন থাকবে কি থাকবে না—এমন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, যে সংযোগের জন্য গ্রাহক টাকা দিচ্ছেন, তার বিপরীতে তিনি কতটা কার্যকর সেবা পাচ্ছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ব্যবহার না করা সংযোগগুলো সহজে বন্ধ করার সুযোগ, বিলের স্বচ্ছতা এবং উপজেলা পর্যায়ে কার্যকর গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।

একসময় টিএন্ডটি ফোন ছিল যোগাযোগের প্রতীক। একটি অফিসে টেলিফোন বাজলে সবাই ছুটে যেত ফোন ধরতে। দূরের আত্মীয়ের কণ্ঠ শুনতে অনেকেই নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা করতেন। সেই সময় এখন ইতিহাস। আজ একটি মুঠোফোনেই পৃথিবী হাতের মুঠোয়। ভিডিও কল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ ল্যান্ডফোনের জায়গা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে।

তবু ল্যান্ডফোন পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয়—এ কথাও বলা যায় না। সরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন জরুরি সেবায় একটি স্থায়ী অফিসিয়াল নম্বরের প্রয়োজন এখনো রয়েছে। তাই ল্যান্ডফোনকে একেবারে বিলুপ্ত করার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিকায়ন এবং সেবার মান বাড়ানোই হতে পারে বাস্তবসম্মত পথ।

লাকসামের একটি পুরোনো টেলিফোন সেট তাই আসলে সারা দেশের যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তনেরই প্রতিচ্ছবি। যে টিএন্ডটি ফোন একসময় মানুষের অপরিহার্য প্রয়োজন ছিল, আজ সেটি অনেক জায়গায় কেবল পুরোনো ঐতিহ্য। এখন সময় এসেছে হিসাব করার—কোথায় এই সেবা সত্যিই প্রয়োজন, কোথায় তা অকার্যকর হয়ে আছে এবং কীভাবে গ্রাহকের অর্থের বিনিময়ে কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা যায়। মুঠোফোনের যুগে ল্যান্ডফোন হয়তো হারিয়ে যাবে না, তবে তাকে টিকে থাকতে হলে সময়ের সঙ্গে বদলাতেই হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *