শোহাদায়ে কারবালার চেহলাম শরীফ ও আখেরী চাহার শোম্বা

\ এ এস এম নুরুন্নবী রহমানী \

              মক্কার মতি, মদীনার জ্যোতি হুজুরে আকরাম (সা.) এর দুই দৌহিত্র হযরত ইমাম হাসান এবং হোসাইন (রা.) পাক পাঞ্জাতনের অন্যতম সদস্য। তাঁদের মহান মর্যাদা বিশ^নন্দিত। এই দুই ভাই- হযরত ফাতেমাতুয্ যোহরা (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর কলিজার টুকরা। ঈমান ও ইসলাম রক্ষায় এ দুই বীর মুজাহিদ ইমাম এসিড পরীক্ষায় ঐতিহাসিক কারবালা প্রান্তরে অংশগ্রহণ করে ‘ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট’ হন। ইমাম হোসাইন (রা.) সত্য-ন্যায়ের পরীক্ষায় অংশ নিতে বিশ^বাসীর প্রতি স্বতঃস্ফ‚র্ত আহŸান জানান। তাঁর দিকনির্দেশনায় বিশে^র দিকে দিকে কোনো না কোনো স্থানে বীর মু’মিন-মুজাহিদগণ মিথ্যার বিরুদ্ধে সদা জিহাদ করে যাচ্ছেন। সত্য কায়েমে এমন জিহাদী চেতনা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, ইনশা-আল্লাহ।

              ঐতিহাসিক কারবালা প্রান্তরে হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)সহ ৭২/৭৩ জন বীর মুজাহিদ তাঁদের রক্তের বিনিময়ে জীবন কুরবানী দিয়ে দ্বীন ইসলামকে চিরতরের জন্য সত্য-ন্যায়ের দ্বীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ঐতিহাসিক কারবালা প্রান্তরে চির অভিশপ্ত ইয়াজীদ ও তার তল্পি বাহিনী বিশ^তাÐব চালিয়েছিল পবিত্র মক্কা-মদীনা শহরে। এ মর্মন্তদ অবস্থায় তিন দিন পর্যন্ত মসজিদের নববীতে আযান-ইক্বামত ও নামাজ হয়নি। বিশ^নিন্দিত ইয়াজীদ ৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৬৩ হিজরিতে মুসলিম বিন আকাবার নেতৃত্বে ১২ হাজার সৈনিক প্রেরণ করে মদীনা শরীফের ‘হাররা’ নামক স্থানে তুমুল যুদ্ধে ইয়াজীদ বাহিনী খাঁটি মু’মিন মুসলমানের নিকট চরমভাবে পরাজিত হয়। ওই সময় ইয়াজীদ বাহিনী আমাদের আক্বা, পেয়ারা রাসূল (সা.)-এর পবিত্র মদীনা শরীফে হাজারো অত্যাচারের স্টীম রোলার চালায়। এতে নবীজি (সা.)-এর ৭০০ জন সাহাবী(রা.)সহ ১০ হাজারের বেশি মু’মিন মুসলমান শহীদ হন। মদীনা শরীফে চরম বেয়াদবি করার পর ইয়াজীদ বাহিনী বায়তুল্লাহ শরীফেও হামলা করে। এতে তারা কা’বায় আগুন ধরিয়ে দেয় এবং কা’বা শরীফের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। ঠিক ঐ সময়ে কুখ্যাত ইয়াজীদ আল্লাহর গজবে পতিত হয়ে তার জীবনসাঙ্গ হয়। ৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর তার অভিশপ্ত জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। উর্দু ভাষায় প্রবাদ আছে, ‘জো করেগা, ওহে ভরেগা’ ও আরবি ভাষায় প্রবাদ আছে, ‘কামা তাদিনু তুদান’; অর্থাৎ, যেমন কর্ম, তেমন ফল।

              চির অভিশপ্ত ইয়াজীদ রাসূলে পাক (সা.)-এর প্রিয়তম দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-কে যেভাবে হেনস্তা ও শহীদ করেছে, ঐ অপকর্মের সহযোগীরা তেমনিভাবে দুনিয়াতে নাজেহাল ও কোণঠাসা হয়েছে। সর্বোপরি অত্যন্ত ঘৃণিত ও নিন্দিতভাবে তাদের জীবনাবসান হয়েছে। বস্ততঃ কুখ্যাত ইয়াজীদ বাহিনীর পরিণতি ছিল অত্যন্ত শোচনীয় এবং মর্মন্তুদ। তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নীতিজ্ঞান সম্পন্ন মুসলমানের জানার প্রয়োজন রয়েছে। হযরত ইমাম হোসাইন(রা.)- এর সাথে ধৃষ্টতা প্রদর্শনকারী জালেমদের শেষ জীবনে কি করুণ পরিণতি হয়েছিল, কীভাবে তাদের অভিশপ্ত জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছে, তার বিবরণ এই ৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ইয়াজীদ বাহিনীর সেনাপতি আব্দুল্লাহ্ বিন জিয়াদ ‘জার’ নদীর তীরে এক সম্মুখ সমরে মুসলিম সেনাপতি মোখতার বাহিনীর হাতে নির্লজ্জভাবে পরাজিত ও নির্মমভাবে খÐ-বিখÐ হয়ে জাহান্নামে প্রেরিত হয়। ঐদিন ২৪৮ জন সেনাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে কতল করা হয়। কারবালা যুদ্ধে

আমর বিন হাজ্জাজ চরম তপ্ত গরমে কঠিন পিপাসার্ত অবস্থায় মরুভ‚মিতে ছটফট করতে থাকে। ঐ অবস্থায় হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদতের অন্যতম হোতা সীমার বিন যিল জৌশন -কে কতল করে তার অপবিত্র লাশ কুকুরকে খেতে দেয়া হয়। আব্দুল্লাহ বিন উসাইন যুহানী, মালেক বিন বশির ও আমর বিন মালিককে মোখতার নিজ হাতে কতল করেন। মালেক বিন বশির ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মাথার টুপি মোবারক খুলেছিল, তার কাফ্ফারা স্বরূপ তার হাত-পা কেটে বিচ্ছিন্ন করে মাঠে রাখা হয়। তপ্ত রোদে চটপট করে তার শেষ পরিণতির অবসান ঘটে।

              দয়াল নবীজি (সা.)-এর বংশের সাহাবী হযরত মুসলিম বিন আকিল (রা.)-এর ঘাতক ওসমান বিন খালিদ ও বশির বিন সমিতকে কতল করে তাদের লাশ আগুনে জ¦ালিয়ে দেয়া হয়, এ যেন দুনিয়ার জমীনে জাহান্নামের আগুনের শাস্তি।

              হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বিরুদ্ধে ওমর বিন সা’দ যে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল, তাতে তার পুত্র হাফিজের সামনে তাকে কতল করা হয় অতঃপর তার পুত্র হাফিজকেও হত্যা করা হয়। এইভাবে ঐতিহাসিক কারবালা প্রান্তরে যেসব পাপিষ্ঠ জঘন্যতম অপরাধ করেছিল- তাদের সকলের জীবন সাঙ্গ হয় অত্যন্ত কঠিন ও মর্মন্তদভাবে।

              চিরদিন একদিকে ইয়াজীদ বাহিনীর অপকর্মের কাহিনী সচেতন মানুষ গাইতে থাকবেন, অন্যদিকে হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)সহ আহলে বাইতের ঐতিহাসিক কারবালার কোরবানীর বাণী প্রচার করবেন মু’মিন-মুসলিম ও সচেতন বিশ^বাসী। পক্ষান্তরে, নামধারী মুসলিম তথা ইয়াজীদ পক্ষের মুনাফিক গোষ্ঠী ইয়াজীদের তথাকথিত প্রশংসা করতে থাকবেন। এটাই নিয়ম, এটাই বিধান। তবে মনে রাখতে হবেÑ ঐসব মুনাফিক চμের দশা হবে ইয়াজীদ বাহিনীর মতো দুনিয়াতে-আখিরাতে। আল্লাহ্ পাক রাব্বুল আ’লামীন আমাদেরকে চিরকাল হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও আহলে বাইতের পক্ষে জীবন-যাপনের তৌফিক নসিব করুন।

              ১০ই মুহররম, ৬১ হিজরী মোতাবেক ১০ই অক্টোবর, ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ রোজ জুমাবার ছিল ঐতিহাসিক কারবালা ট্রাজেডি দিবস। তার ৪০ দিনের মাথায় ২০ সফর হচ্ছে শোহাদায়ে কারবালার চেহলাম শরীফ বা চল্লিশা- যা বিশে^র অনেক স্থানে অনেক মু’মিন-মুসলিম ও আশেক্বানগণ অতীব শ্রদ্ধাভরে পালন করে শোহাদাগণের প্রতি ঈমানী মুহাব্বত প্রদর্শন করে থাকেন। বস্ততঃ আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা, মহান আল্লাহ্ পাকের নির্দেশ- যা পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে।

              আমাদের পেয়ারা নবী (সা.)-এর জীবনেও সুখ-দুঃখের সংযোজন ছিল। তিনি মানব জাতির হেদায়তের জন্য দুনিয়াতে তাশরীফ আনেন। তবে তিনি ছিলেন এক অনন্য মহাপুরুষ। যাঁর তুলনা বিশে^র কেউ নেই, তাঁর তুলনা তিনি নিজেই।

              মূলতঃ তিনি হচ্ছেন একজন বে-নজীর ও বে-মেসাল মহামানব। তিনি ছিলেন হাবীবুল্লাহ্ বা আল্লাহ্ পাকের প্রিয় বন্ধু।

              বলতে গেলে, তিনি সর্বশ্রেণির মানুষের জন্য ছিলেন মহান আদর্শ। তিনি রক্তে-মাংসে গড়া একজন নূরানী মানুষ, তাঁর নূর থেকেই তামাম জাহান সৃষ্ট। কুল-কায়নাত তাঁর নূরের কাছে চিরঋণী। তাঁরও হায়াত, মওত তথা ওফাত আছে। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে ২৯ আগস্ট মোতাবেক ১২ই রবিউল আউয়াল শরীফ রোজ সোমবার সুবহে সাদিক প্রাক্কালে হযরত মা আমিনা (রা.)-এর কোল উজালা করে নূরের চামচ মুখে ধারণ করে বায়তুল্লাহ্ শরীফের অদূরে বাবা আব্দুল্লাহ (রা.)-এর কুটিরে মাওলাদুন্নবীতে শুভ জন্মগ্রহণ করেন। ইতোপূর্বে তিনি মহান রবের দরবারে নবী হিসেবে ঘোষিত ছিলেন। তিনি এ ভব-সংসারে মানব ও জি¦ন জাতির কাছে সত্য দ্বীন ইসলাম প্রচার-প্রসারে সারাজীবন মহান নবুয়তী দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এভাবে জীবনের ৬৩টি বসন্ত অতিμম করে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ৮ জুন রোজ সোমবার উম্মতে মোহাম্মদীকে এতিম বানিয়ে রফিকুল আ’লার ডাকে লাব্বাইক বলেন। আগেই বলেছিলাম নবীজি (সা.)-এর জীবনেও ছিল সুখ-দুঃখ, সুস্থতা-অসুস্থতা, আনন্দ-বিষাদ ইত্যাদি। তিনি ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে মোতাবেক ৭ম হিজরীতে খাইবার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এতে এক হিংসুক ইহুদি মহিলা নবীজিকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে “বিষ মিশ্রিত গোশত” খেতে দেন। নবীজি (সা.) ও তাঁর সাহাবীরা উক্ত গোশত সাবলীলভাবে ভক্ষণ করেন। এতে কয়েকজন সাহাবী শাহাদত বরণ করেন। এতে নবীজি (সা.)-এরও কিছুটা অসুবিধা হয়, তবে তিনি বিষμিয়ায় শহীদ হন নি, আলহামদুলিল্লাহ্। এতে তিনি-ই যে সত্য নবী তা দুষ্ট মহিলা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পায়। এ বিষμিয়ায় নবীজিও ৪ বছর কিছুটা কষ্টবোধ করেন। অবশেষে ১১ হিজরী সফর মাসের শেষ দিকে তিনি রোগ-যাতনা জটিলতার সম্মুখীন হন।

              এতে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) চরম হতাশ ও অসহায় হয়ে পড়েন। এই মুহূর্তে সফর মাসের ২৯ তারিখ রোজ বুধবার সকালবেলা তিনি কিছুটা সুস্থতা বোধ করেন। এতে সাহাবায়ে কেরামের মনে মহা আনন্দের ঊর্মি সৃষ্টি হয়। তাঁরা এই মহাখুশীতে নানা প্রকারের নফল ইবাদত ও সাদাকা-খায়রাত করতে থাকেন। তাঁরা বারবার মহান রবের দরবারে নবীজি (সা.)-এর সুস্থতার জন্যও প্রাণপণে দোয়া করতে থাকেন। তাঁরা নবীজি (সা.)-কে কিছুটা সুস্থ দেখে আশার আলো দেখতে থাকেন। কিন্ত মহান রবের ইচ্ছার কথা কেউ জানেনা। সফর মাসের ২৯ তারিখ শেষ বুধবার পড়ন্ত বেলায় ফের তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এভাবেই ১২ দিন পর ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ৮ই জুন রোজ সোমবার তিনি তাঁর বিবি আয়েশা (রা.)-র হুজুরা শরীফে মহান রবের নিকট চলে যান এবং ঐ কক্ষেই মাদফুন হন। তিনি ক্বিয়ামত পর্যন্ত আমাদের জন্য মাগফেরাত করবেন।

              তাই প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও ৪ঠা আগস্ট শোহদায়ে কারবালার চেহলাম শরীফ ও ১২ই আগস্ট বুধবার পবিত্র আখেরী চাহার শোম্বা পালিত হবে। কেউ কেউ ওইদিন রোজা পালন ও নফল ইবাদতসহ ছদকাÑখায়রাত করে নবীজির ইশক মহব্বত হাসিলে তৎপর হবেন। আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে নবীজি ও তাঁর আহলে বাইতের প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি ও ভালোবাসা স্থাপনে খাস তাওফিক দেন- আমীন। লেখক: অধ্যক্ষ, পাটোয়ার ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা, নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা। ০১৭০৪-৯৭৫১০৪

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *