হত্যাকাণ্ড, পদত্যাগ ও নীরব বিদায়: বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাসে নানা অধ্যায়

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের দায়িত্ব ছাড়ার মধ্য দিয়ে দেশের রাষ্ট্রপতিদের বিদায়ের ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন একটি অধ্যায়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হলেও স্বাধীনতার পর থেকে এই পদে থাকা অধিকাংশ ব্যক্তির বিদায় হয়েছে নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন, সংকট কিংবা আকস্মিক ঘটনার মধ্য দিয়ে। ফলে পূর্ণ মেয়াদ শেষে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব ছেড়ে যাওয়ার নজির তুলনামূলকভাবে কম।

মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর পদে থাকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সর্বশেষ তাঁর দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত সেই আলোচনারই পরিণতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির বিদায় উপলক্ষে নির্ধারিত কোনো বাধ্যতামূলক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিকতা নেই। তবে ২০২৩ সালে দায়িত্ব শেষে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে বঙ্গভবনে গার্ড অব অনার, লালগালিচা সংবর্ধনা এবং আনুষ্ঠানিক বিদায়ের মাধ্যমে সম্মান জানানো হয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হয়।

স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জিয়াউর রহমানও ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে নিহত হন। এ দুই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদকে ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতার অন্যতম বড় উদাহরণ।

অন্যদিকে কয়েকজন রাষ্ট্রপতিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে। খন্দকার মোশতাক আহমদ মাত্র কয়েক মাস দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা নেতা এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীও রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে সাত মাসের মাথায় রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান। আবার বিচারপতি আবদুস সাত্তার, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ও ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের দায়িত্বকালও দেশের রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।

১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়। এরপর থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব মূলত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক হলেও রাজনৈতিক পালাবদলের প্রভাব এই পদেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচনের পর ক্ষমতার পরিবর্তনের কারণে এক সরকারের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে প্রায়ই অন্য সরকারের আমলে বিদায় নিতে হয়েছে।

২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জিল্লুর রহমান, মো. আবদুল হামিদ এবং মো. সাহাবুদ্দিন। তাঁদের মধ্যে জিল্লুর রহমান দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মারা যান, আবদুল হামিদ পূর্ণ দুই মেয়াদ শেষ করেন এবং মো. সাহাবুদ্দিনের বিদায় ঘটছে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই পদের মর্যাদা ও বিদায়ের ধরন অনেক সময় নির্ধারিত হয়েছে সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দিয়ে। সে কারণেই দেশের ১৭ জন রাষ্ট্রপতির বিদায়ের ইতিহাসে একেকজনের শেষ অধ্যায় একেক রকম।

মো. সাহাবুদ্দিনের দায়িত্ব ছাড়ার মধ্য দিয়ে সেই ইতিহাসে যুক্ত হলো আরও একটি নতুন অধ্যায়, যা দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *