রংপুরে চার খুন: ছাদে তিনজনকে হত্যা, আয়ুশ দেখে ফেলায় তাকেও হত্যা—পুলিশ

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডে নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে পুলিশ। রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেছেন, গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে বাড়ির তৃতীয় তলার খোলা ছাদে হত্যা করা হয়। পরে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে লাশগুলো যাতে দেখা না যায়, সে জন্য মা ও মেয়ের মরদেহ ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির দিকে সরিয়ে রাখা হয়।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য জানান।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস প্রায়ই গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করতে যেতেন। ছাদের চারপাশে দেয়াল থাকায় বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। তাঁরা পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে মাদক সেবন করতেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশ কমিশনার জানান, ঘটনার রাতে দুই তরুণ মিলে আটটি ইয়াবা সেবন করেন। ভোরের দিকে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাঁদের দেখতে পান এবং ধমক দেন। পুলিশের দাবি, এরপর মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অভিযুক্তরা তাঁকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।

পুলিশের দেওয়া তথ্যে আরও বলা হয়, গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়ে চিৎকারের শব্দ শুনে ছাদে চলে এলে তাঁদেরও হত্যা করা হয়। এরপর দুই তরুণ নিচতলায় গিয়ে বাড়ির বিদ্যুতের তার কেটে দেন। পুলিশের ধারণা, সিসিটিভি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতেই এ কাজ করা হয়েছিল।

এরপর মা ও মেয়ের মরদেহ ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির দিকে সরিয়ে রাখা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। পুলিশের মতে, পাশের বাড়ির ছাদ খুব কাছাকাছি হওয়ায় সেখান থেকে লাশ দেখা যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

পুলিশ কমিশনার জানান, পরে গণপতি চক্রবর্তীর কক্ষে ঢোকার পর ১২ বছর বয়সী আয়ুশ চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখে ফেলে। শিশুটি তাঁকে চিনতে পেরে প্রশ্ন করলে পাশের বাড়ির কেউ শব্দ শুনে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কায় তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।

তবে এই ঘটনায় পুলিশের আগের বক্তব্যের সঙ্গে নতুন বক্তব্যের কিছু পার্থক্য দেখা গেছে। গত রোববার পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, গণপতি চক্রবর্তীকে ছাদে, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে সিঁড়িতে এবং আয়ুশকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে। নতুন সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার বলেন, আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে অভিযুক্তরা দাবি করেছেন, আয়ুশ ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখে ফেলেছিল।

হত্যার কারণ নিয়েও নতুন তথ্য সামনে এনেছে পুলিশ। আগে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার ঘটনাকে হত্যার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এখন পুলিশ বলছে, জমিজমা সংক্রান্ত পুরোনো ক্ষোভও থাকতে পারে। গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার সিদ্ধার্থদের পূর্বপুরুষের জমি কিনেছিলেন এবং এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আর্থিক অসন্তোষ ছিল কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে।

এ ছাড়া দুই পরিবারের সামাজিক দূরত্ব বা পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।

গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ার একটি বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের বক্তব্যের স্থান, সময় ও হত্যার কারণ নিয়ে পরিবর্তন নিয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন তুললেও পুলিশ কমিশনার মাত্র দুটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সংবাদ সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বদেশ রেস্তোরাঁ এন্ড পাটি সেন্টার