
ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে। লোহিত সাগরের উপকূলীয় মোখা শহরের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তাইজ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মারিবের আশপাশে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি লড়াই চলছে। একই সময়ে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলেও হামলার দাবি করেছে হুতিরা। ফলে দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ আবার বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তাইজ শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে মাকবানাহ জেলার কাধা এলাকায় হুতি ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। মোখা শহর হুতিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর ওই এলাকায় এটিই দুই পক্ষের প্রথম বড় ধরনের সরাসরি লড়াই বলে জানা গেছে। সরকারি বাহিনী হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে। পাশাপাশি উভয় পক্ষই ওই এলাকায় নতুন করে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলের মারিব শহরের পশ্চিমাঞ্চলেও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। আল-মাশজাহ ও আল-জোর এলাকায় হুতিদের একটি বড় হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে সরকারি বাহিনী। মাস ক্যাম্পের আশপাশেও গোলাগুলি চলছে এবং হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হচ্ছে।
মারিব ইয়েমেনের জন্য বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসক্ষেত্র ছাড়াও শহরটিতে সামরিক স্থাপনা রয়েছে। উত্তরাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর অন্যতম প্রধান সরবরাহকেন্দ্র হওয়ায় মারিবের নিয়ন্ত্রণ যে পক্ষের হাতে থাকবে, দেশটির অর্থনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে তার বড় প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার মধ্যে সৌদি আরবও হুতিদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে। হুতিদের দাবি, তাদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় ৪৮ ঘণ্টায় সৌদি বাহিনী ১২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে। তাইজ ও মারিবের আশপাশেও এসব হামলা হয়েছে বলে গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের শারুরাহ সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর দাবি, ঘাঁটির অস্ত্রের গুদাম এবং কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন সৌদি আরবের জাজান প্রদেশের আল-তুওয়াল এলাকাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই ঘটনায় কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার জন্য হুতিদের দায়ী করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
এদিকে হুতিদের হামলার কারণে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হয়েছে। ড্রোন হামলার জেরে দেশটির ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর মতো সীমিত পরিমাণ তেল মজুত রয়েছে। মিসরেও সৌদি আরবের কিছু তেল সংরক্ষিত আছে বলে জানা গেছে।
পাইপলাইন দ্রুত চালু করা সম্ভব না হলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এতে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের উল্লেখযোগ্য অংশ। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপরও পড়ছে। জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থার হিসাবে, জুলাই থেকে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর প্রায় ৭৬ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। সাম্প্রতিক এক সপ্তাহেই দুই হাজারের বেশি মানুষ লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূল থেকে পালিয়ে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন।
ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক বিভাজন। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেন সরকারের সমর্থনে সামরিক অভিযান শুরু করে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত অনেকটা কমে এলেও রাজনৈতিক সমাধান না হওয়ায় দেশটিতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি।
সরকারপন্থী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রাকে সহজ করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন কয়েকজন বিশ্লেষক। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক মতবিরোধ ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে হুতিদের মোকাবিলা করা সরকারি বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
পশ্চিম উপকূলে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে সরকারি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবিও করা হয়েছে। সরকারপন্থী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের দাবি, ৯ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হুতিদের সঙ্গে সংঘর্ষে তাদের পাঁচ শতাধিক সদস্য নিহত এবং প্রায় দেড় হাজার আহত হয়েছেন। একই সময়ে হুতিদের আরও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে বাহিনীটি। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত বাড়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরানের দাবি, হরমুজের কাছাকাছি কাসেম দ্বীপের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। এতে একজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বাহরাইন জানিয়েছে, তারা ওই বৈঠকে অংশ নেবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, তেল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে একসঙ্গে উত্তেজনা বাড়ায় আঞ্চলিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মারিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।