
দেশে উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে এমন কৃষি ও খাদ্যপণ্যের আমদানি ধীরে ধীরে কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কৃষকের কাছে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত জাত, সেচ ও কৃষিযন্ত্রের সুবিধা দ্রুত পৌঁছে দিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
রোববার সচিবালয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এসব নির্দেশনা দেন। বৈঠকে কৃষি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, চলমান কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেসব কৃষিপণ্য দেশের মাটিতে উৎপাদন করা সম্ভব, সেসব পণ্যের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষি গবেষণা জোরদার করার পাশাপাশি নতুন ও উন্নত জাত উদ্ভাবন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সেচ ও যান্ত্রিকীকরণের সুবিধা কৃষকের কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল ও কৃষকের জন্য লাভজনক খাতে পরিণত করার তাগিদ দেন তিনি। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ কমানো এবং কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে সরিষার উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে ১৫ লাখ ৩৪ হাজার মেট্রিক টনে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৫ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছেছে।
পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কৃষকের পর্যায়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণে বায়ু চলাচলভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের উন্নত জাতের চাষ আরও বিস্তৃত করার কার্যক্রম চলছে।
লবণাক্ততা, খরা ও জলাবদ্ধতার মতো প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে—এমন নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন ও মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। কৃষি গবেষণার অগ্রগতি তুলে ধরে কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন ফসলের মোট ১ হাজার ৯০টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে ধানের জাত রয়েছে ১৫৫টি। এ ছাড়া কৃষিকাজ সহজ ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এক হাজারের বেশি কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের তথ্যও তুলে ধরা হয়।
কৃষিতে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা ও উৎপাদন ব্যয় কমাতে যান্ত্রিকীকরণ আরও বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দেশীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবন ও উৎপাদনের পাশাপাশি কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মতো যন্ত্র কৃষকদের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়।
সেচব্যবস্থায় প্রচলিত জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। বর্তমানে দেশে ২ হাজার ৬১৭টি সৌরচালিত সেচব্যবস্থা রয়েছে বলে জানানো হয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর সেচব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের সেচ খরচ কমার পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির ওপর চাপও কমবে বলে বৈঠকে মত দেওয়া হয়।
কৃষকদের সরকারি সহায়তা আরও সরাসরি ও কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে কৃষক কার্ড কর্মসূচির বিষয়েও আলোচনা হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কৃষককে কার্ড দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
বৈঠকে কৃষিযান্ত্রিকীকরণ, সৌর সেচ, খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ এবং কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বিপণন নিয়েও আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের খরচ কমানো, বাজারব্যবস্থা উন্নত করা এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন।