পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সা. সম্পর্কিত পর্যালোচনা

\ অধ্যক্ষ ইয়াছিন মজুমদার \

              নবী সঃ এর জীবন ও কর্ম আলোচনা, নবী সঃ সম্পর্কে জানা, ব্যক্তি  সমাজ রাষ্ট্র পরিচালনায় যে আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন সে আদর্শ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা প্রতিটি মোমিনের কর্তব্য। এক শ্রেণীর মানুষ নবী সঃ এর জন্মদিন পালন ও কিছু আচার অনুষ্ঠান করাকেই ইবাদত ও নবী প্রেম বলে মনে করায় এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে কিছু প্রশ্ন এবং তার পর্যালোচনা  নিম্নে দেয়া হলো-

প্রশ্নঃ রবিউল আউয়াল মাসে ঈদে মিলাদুন্নবীর নামে হোক আর সিরাতুন্নবী নামে হোক জন্ম ও জীবনী আলোচনা হয়ে থাকে। মতবিরোধকারীরাও সিরাতুন্নবী নামে অনুষ্ঠান করে তাহলে ঈদে মিলাদুন্নবী নাম নিয়ে এত বিরোধীতা কেন?

উত্তরঃ নবী সঃ এর জীবনী বছরের যে কোন সময় আলোচনা করা বৈধ, রবিউল আউয়াল মাসে বেশি করে করলেও সমস্যা আছে মনে করি না। কিন্তু মিলাদুন্নবী অর্থাৎ জন্মদিন উদযাপন ইসলামী নিয়ম নয়, এটি বিজাতীয় সংস্কৃতি, যেমন বৌদ্ধরা তাদের ধর্মগুরুর  জন্ম ও মৃত্যুদিবস উদযাপন হিসেবে বৌদ্ধপুর্ণিমা পালন করে, হিন্দুরা শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন হিসেবে জন্মাষ্টমি পালন করে, খৃষ্টানরা যিশু খৃষ্টের জন্মদিন হিসেবে ক্রিস্টমাস ডে পালন করে, কিন্তু নবী সঃ ও সাহাবায়ে কেরাম নবী সঃ বা আর কারো এ ধরণের জন্মদিন পালন করেননি, আমাদের দ্বীন পালনের ভিত্তি হলেন যারা তারা যা করেননি আমরা কেন নতুন আবিষ্কৃত ইবাদত করবো, ইবাদত হিসেবে কিছু করতে হলে অবশ্যই তাদের আমল অনুযায়ী দলিল প্রয়োজন। বরং হিজরি সন গণনা শুরুর নবী সঃ এর জন্ম বা ইন্তেকাল থেকে গণনার প্রস্তাব এবং আজান শুরুর পরামর্শে আগুন জ্বালানো বা শিঙ্গাফুকের প্রস্তাব বিজাতীয় সংস্কৃতির সাথে মিলে যায় বিধায় গ্রহণ করা হয়নি। ইহুদীদের কথা- ‘আমরা ঈদ হিসেবে গ্রহণ করতাম’ এবং আয়াতে বর্ণিত ‘নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ে খুশি হও’ এগুলো কি সাহাবায়ে কেরাম জানতেন না? তাহলে উনারা কেন এ রকম বিশেষ দিনকে খুশির দিন হিসেবে উদযাপন করলেন না? ইসলামে ঈদ নিচক আনন্দ খুশি হিসেবে নয় বরং নামাজসহ ইবাদতের সংমিশ্রণ। ঈদ মানলে ঈদের নামাজ কোথায় আদায় করেন? নবী সঃ এর মক্কি জীবন হিসাব না করলেও মদিনার জীবন দশ বছর। এ দশ বছরে প্রতি বছর জন্মদিনে বা জন্ম মাসে কোন সাহাবি এ দিনকে ঈদ হিসেবে পালন করা বা অন্য কিছু সাহাবীকে নিয়ে কোন আমল, কোন অনুষ্ঠান, কোন সমাবেশ করেন নি। এ হলো মিলাদ বা জন্ম আলোচনা আর ঈদে মিলাদুন্নবীর মধ্যে পার্থক্য।

প্রশ্নঃ একব্যক্তি আবু লাহাবের মৃত্যুর পর তাকে স্বপ্নে দেখে অবস্থা জিজ্ঞেস করলে সে বলল খুব অসুবিধায় আছি, তবে মোহাম্মদের জন্ম খবর নিয়ে যে দাসি সংবাদ নিয়ে এসেছিল, খুশি হয়ে তাকে যে দুই আঙ্গুল দিয়ে তাকে আযাদ করেছি, সে দুই আঙ্গুল দিয়ে তৃষ্ণা নিবারণের জন্য মিষ্টি পানীয় আসে, তা চুষে খেয়ে কিছু তৃপ্তি পাই। একজন কাফের যদি জন্মখুশিতে এ মর্যাদা পায়, আমরা ঈমানদারগণ আরো বেশি সুবিধা পাব না কেন?

উত্তরঃ আবু লাহাব খুশিতে দাসী আযাদে উপকৃত হওয়ার বিষয়টি একজন স্বপ্নে দেখেছেন। নবী ছাড়া আর কারো স্বপ্ন কি আমল করার জন্য দলিল হতে পারে? তা ছাড়া এ ঘটনা কি সাহাবায়ে কেরাম রাঃ জানতেন না? এ রকম হলে খুশিতে তারা সব উজাড় করে দিতেন এবং তা অসংখ্য সহীহ হাদীসে বর্ণিত হত, কিন্তু জন্মদিন পালনকারিরা অনেক জাল হাদিস বানিয়েছে, যেমন আবু বকর রাঃ বলেছেন-  যে নবী সঃ এর জন্মদিনে এক দেরহাম ব্যয় করবে ——- ইত্যাদি। এ বিষয়ে এত জাল হাদিস বানানোর প্রয়োজন হতো না।

প্রশ্নঃ সহীহ হাদীসের বর্ণনা নবী সঃ জন্মদিনে রোজা রাখতেন, তাহলে দেখা যায় তিনি জন্মদিন পালন করতেন, আমরা করলে সমস্যা কোথায়?

উত্তরঃ নবী সঃ সোমবার রোজা রাখতেন তার কারণ কি শুধু একটি ছিল? হাদিসে বর্ণিত এ বার আমার জন্ম, এ বার অহি নাযিল হয়েছে,এ বার আমল আল্লাহর কাছে উপস্থাপন করা হয়, আমার আমল রোজা অবস্থায় উপস্থাপন হোক এটা আমি চাই। তাহলে শুধু একটা কারণ উল্লেখ করেন কেন? ধরে নিলাম জন্ম বার হিসেবে নবী সঃ রোজা রাখতেন, তাহলে সাহাবায়ে কেরাম রাঃ নবী সঃ এর পুর্ণ অনুসরণ করা সত্তে¡ও এ বারে রোজা রাখতেন না, এতে এ কথা প্রমাণিত হয় যে জন্মবারে কেহ শুকরিয়া স্বরুপ রোজা বা এ জাতীয় কিছু করলে তা একান্তই ব্যক্তিগত, অন্যরা তা করার মধ্যে কোন ফায়দা নেই, সামান্য ফায়দা থাকলেও সাহাবায়ে কেরাম রাঃ তা ছাড়তেন না। শরীয়তের বিধান হলো ঈদের দিন রোজা রাখা নিষেধ, এ দিন ঈদের মত হলে নবী সঃ কিভাবে রোজা রাখতেন?

প্রশ্নঃ এ দিন ঈদ হিসেবে পালন করা যাবে না এমন দলিল আছে কি?

উত্তনঃ নীতিমালা হলো কোন বিধান পালন করতে দলিল লাগবে, নিষেধ না থাকা আমলের দলিল হবে না। যেমন নামাজ পাঁচ ওয়াক্ত, আমি যদি বলি ছয় ওয়াক্ত পড়া যাবে, কারণ ছয় ওয়াক্ত নিষেধ এমন দলিল নেই, তা কি গ্রহণযোগ্য হবে? ঈদের নামাজের আগে ঈদগাহে নফল পড়া জায়েজ নেই, কারণ নবী সাঃ বা সাহাবায়ে কেরাম রাঃ পড়েন নি, অথচ তারা পড়তে নিষেধ করেছেন এমন দলিল নেই, ঠিক তেমনি উনারা ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করেন নি এটাই দলিল হিসেবে যথেষ্ট, নিষেধ করেছেন এমন দলিল প্রয়োজন নেই। ইবাদত হিসেবে কিছু করতে কিছু দিক খেয়াল রাখতে হবে। ১) ছবব বা কারণ, যেমন- নামাজ ৫০ ওয়াক্ত ফরয হয়েছিল, অনুরোধের কারণে ৫ ওয়াক্ত হয়েছে, এখন যাদের অবসর, ৫০ ওয়াক্ত পড়ার সময় আছে, আপনি কি তাদের ৫০ ওয়াক্ত পড়ার নিয়ম করতে পারবেন? ২) জিনছ, যেমন কোরবানি, আপনি কি বাহিমাতুল আনআম দলিল দিয়ে ঘোড়া, গাধা, বড় তার্কি মোরগ, হরিণ ইত্যাদি দিয়ে কোরবানি করতে পারবেন? ৩) আদদ বা সংখ্যা, যেমন- জোহরের উপর কেয়াস করে জুমআ চার রাকাত, জোহরের ফরয কিছু বেশি ইবাদত মনে করে ছয় রাকাত পড়তে পারবেন? ৪) কাইফিয়ত, যেমন- নামাজের বিধান সব পালন করলেন, কিন্তু আগে সেজদা পরে রুকু এ ভাবে নবী সঃ এর দেখানো পদ্ধতির ব্যতিক্রম কি করতে পারবেন? ৫) মাকান বা স্থান, যেমন- কাবায় এক ওয়াক্ত নামাজে এক লক্ষ রাকাতের সাওয়াব এর উপর কিয়াস করে হজ্বের সময় আরাফায় অবস্থান না করে কাবা চত্বরে অবস্থান করলে হজ্ব হবে কি? ৬) জামান বা সময়, যেমন- শীতকালে ফজর কষ্টকর, বিশেষ করে বৃদ্ধদের জন্য। আল্লাহ কারো উপর সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপান না, এ দলিল দিয়ে বৃদ্ধদের জন্য সুর্যের তাপ বাড়লে ফযর পড়া চালু করা যাবে কি? নবী সঃ ও সাহাবায়ে কেরাম রাঃ এর পদ্ধতির বাইরে গিয়ে কোন ইবাদাত করা সঠিক নয়, তাহলে তাদের পদ্ধতির বাইরে গিয়ে মিলাদুন্নবী পালন করা কতটুকু সঠিক হবে?

প্রশ্নঃ নবীজির আগমনে মদিনা বাসি খুশি হয়ে গিয়েছিল তালায়াল বাদরু আলাইনা—- আমরা খুশি প্রকাশ করলে অসুবিধা কি?

উত্তরঃ নবীজির আগমনে মদিনা বাসি খুশি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু প্রতিবছর কি তারা এ রকম গিয়েছিল? তারা প্রতিদিন নবীর আগমনের অপেক্ষায় মদিনার প্রান্তে গিয়ে অপেক্ষা করতো, রোদ্রের তাপ বেড়ে গেলে ফিরে আসতো, কখনো আনন্দ প্রকাশ করেনি, যখন নবীজিকে দেখা গেল তখন আনন্দ প্রকাশ করেছিল। প্রতি বছর এমন দিনে বা নবীজির ইন্তেকালের পর কি কোন বছর এরূপ খুশি প্রকাশ করেছিল? এখন আমাদের কাছে নতুন করে কি নবীর আগমন ঘটে যা দেখে আমরা খুশি প্রকাশ করবো? তারা নবীজিকে দেখে আনন্দ প্রকাশ করেছিল, আপনি কি নবী সঃ কে দেখে আনন্দ প্রকাশ করেন?

প্রশ্নঃ আল্লাহ কোরআনে নবীদের জন্ম আলোচনা করেছেন, সাহাবাদের কেহ কেহ নবী সঃ কখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন এ ধরণের আলোচনা করেছেন। তাহলে আমরা জন্ম আলোচনা করলে দোষ কোথায়?

উত্তরঃ আমরা ও বন্ধু বান্ধব একত্র হলে কে কখন জন্ম গ্রহণ করেছে আলোচনা করি, জন্মনিবন্ধন করতে, আইডি কার্ড করতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রেজিস্ট্রেশন করতে জন্ম তারিখ নিয়ে আলোচনা করি, আপনারা বলুন এ আলোচনা আর জন্মদিন পালন করা কি এক? ইবাদত হিসেবে সওয়াবের নিয়তে জন্মদিনে কিছু পদ্ধতি আবিষ্কার করা এবং তাকে সাওয়াব বা ইবাদত মনে করা, আর জন্ম আলোচনা কি এক? ইবাদত বা সাওয়াব মনে করতে হলে নবী সঃ ও সাহাবায়ে কেরাম রাঃ এ আমল করতেন কিনা তা দেখতে হবে।

প্রশ্নঃ দিন তারিখ ঠিক করে মাহফিল করা, অনুষ্ঠান করা অবৈধ নয়,তা হলে মিলাদ দিন তারিখ ঠিক করে করলে সমস্যা কোথায়?

উত্তরঃ দিন তারিখ ঠিক করে কোন প্রোগ্রাম করায় অসুবিধা নেই, দিন তারিখ ঠিক না করলে মেহমান আসবে কোন দিন? অসুবিধা হলো কোন নির্দিষ্ট দিনে বা জন্মদিনে বা জন্ম মাসে কোন প্রোগ্রাম করাকে আবশ্যক ও সাওয়াবের কাজ বা ইবাদত মনে করা এবং এ জন্য কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করা, যা নবী সঃ বা সাহাবায়ে কেরাম রাঃ করেননি এবং এ দিনে বা এ পদ্ধতিতে করায় কোন সাওয়াব আছে বলেন নি। উনারা সাহাবায়ে কেরাম রাঃ কে সত্যের মাপকাঠি বলেন আর আমলের জন্য মাপকাঠির বাইরে গিয়ে দলিল খোঁজেন এটা স্ব বিরোধী কথা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বদেশ রেস্তোরাঁ এন্ড পাটি সেন্টার